সম্পর্ক!

শায়লার আজ খুব মন খারাপ। ছেলে টা সেই কখন থেকে গাল ভার করে আছে বাবার কাছে যাবে বলে। ৮ বছরের ছেলে কে শায়লা কিভাবে বুঝায় যে বাবা কে চাইলেই পাওয়া যাবে না!

শায়লা পরম আদরে ছেলের মাথায় হাত রাখে। ছোখ দুটো ভিঝে উঠে।
” আরি ”
” হুম ” ঠোট ভেঙে আরি জবাব দেয়।
” বাবা সামনের সপ্তাহ আসবে তুমায় দেখতে ”
” নাহ! আমি বাবা কে এখন চাই। ” বলেই আরি অভিমানে মুখ ভার করে।
” বাবা তো অনেক দুরে থাকে বাবা। বললেই আসতে পারবে না”
শায়লার কপালে বিরক্তির ভাজ। আরি দু হাতে মা কে জরিয়ে ধরল ..
” মামুনী, বাবা কেন আমাদের সাথে থাকে না? বাবা কে নিয়ে এসো না মামুনী ”
“হুম”
বলেই শায়লা শাড়ির আচলে ছোখ টি মুছলো। তড়িঘড়ি আরি কে গোসল নিতে পাঠিয়ে, দুপুরের খাবার টেবিল এ সাঝাতে ব্যাস্ত হয়ে গেলো।
শায়লা রিজভী। বয়স ৩০। একটি ফুটফুটে ছেলের গর্বিত মা। রায়হান এর সাথে তার সেপারেসন হয়ে গেছে আজ ৪ বছর। আরি তখন খুব ছোট। কিছুই বুজতনা এসবের। এখন অনেক কিছু বুঝে। ওদের ডিভোর্স টা এখনো হয়নি। আরি বাধ সাঝে। কিছুটা পরিবার, কিছুটা নিজের অবচেতন মনের আবেগ ও যেন শায়লার মুক্তির পথে বিশাল বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। কি করবে ভেবে পায়না শায়লা। এক দিকে তার রক্ষনশীল পরিবারের সন্মান হানীর ভয়, অন্য দিকে আরি। এ যেন এক বিশাল অথৈ সাগরে পরে আছে শায়লা। রায়হান এর কাছে ফিরে যাবার ও ইচ্ছে নেই। অনেক গুলো বছর পরাধীনতার শিকল পায়ে কাটিয়েছে শায়লা। অনাদর, অবহেলা গায়ে মেখে নিয়েছিল অলংকার ভেবে। কিন্তু এভাবে কতদিন! যেদিন রায়হান এর হিসাবের পালা এলো, রায়হান ক্ষীপ্ত বাঘ হয়ে গর্জে উঠল।
এই পুরুষ শাসিত সমাজে, নারী কেবল মেনে নিতে ও মানিয়ে নিতে বাদ্ধ্য। নারীই কেবল জবাবদিহি করবে। হোক সে নির্দোষ। পুরুষের জন্ম কেবল শাসাতে, শোষিত হতে নয়। আর তাইতো শেষ রক্ষা হলনা। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দু জমে যেমন এক সাগর হয়, তেমনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিমান আর অভিযোগ গুলো জমে একদিন বিস্ফোরন ঘটল। রায়হান আর শায়লা, কেউ কাউ কে আর মানিয়ে নিতে পারছিল না। আলাদা হয়ে গেল।

আরির গোসল শেষ। গুটি গুটি পায়ে টাওয়েল টা জরিয়ে মা এর পাশে এসে দাড়ালো।
” মামুনী ভাত ”
বলেই আরি কাপড় পরতে দৌড়ে গেল তার রুমটার দিকে।
শায়লা আজ শর্ষে  ইলিশ করেছে। আর আলু পটল। ইলিশ ডিম আরির খুব পছন্দ। ডিম টা আলাদা ভাঝা করেছে আরির জন্য। শর্ষে ইলিশ শুভ’র ও খুব পছন্দ। একদিন শুভ কে শর্ষে  ইলিশ করে খাওয়াবে বলে ভাবছে শায়লা।

শুভ। শায়লার হাজারো হতাশার মাঝে এক টুকরো আনন্দ। আরি কে ভাত মেখে খাওয়াতে খাওয়াতে আনমনা হয়ে গেল শায়লা।
শুভর কথা ভাবছে। ওদের সম্পরক টা নিয়ে ভাবছে।  শুভ টগবগে এক তরুন যুবক। সান্ত, ভদ্র, শিক্ষিত। শায়লার সাথে গত বছর পরিচয়। শায়লা কে কেন যে এত ভালবাসে শুভ…!!! শায়লাও বাসে, কিন্তু মাঝ খানে বাধ সাঝে তার সন্তান, সমাজ এর রীতি নীতি। আরো বড় বাধা তার অসমাপ্ত অতীত।
ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ ফোন টা বেজে উঠল। আরির খাওয়া শেষ। হাত টা ধুতে ধুতে ফোন টা কানে নিল শায়লা।
“হুম শুভ বল ”
চোখে মুখে এক আলোর ঝিলিক খেলে গেল শায়লার।
“কি করছো? ওপাশ থেকে জিজ্ঞেস করল শুভ।
“আরি কে খাওয়ানো শেষ করলাম”।
” তুমি খেয়েছো শালু? ” “নাহ! খাব একটু পর। তুমার খাওয়া হয়েছে? ”
” হ্যা ” বলল শুভ।
“আচ্ছা, আমি ফ্রি হয়ে কল দিচ্ছি। আরির ন্যাপ টাইম এখন ” বলেই শায়লা আরি কে আড় চোখে দেখল।
” ওকে। এই শুনো “শুভর ব্যাকুল কন্ঠ।
“হুম” শায়লা জবাব দেয়।
” মেডিসিন টা ঠিক মত নিও। ফ্রি হয়ে কল দাও”
“আচ্ছা ” বলেই শায়লা ফোন টা নামিয়ে রাখল।
শুভর মুখে “শালু” ডাক টা কি অদ্ভুত লাগে শুনতে! নিজের অজান্তেই একটা লাজুক হাসি খেলে গেল শায়লার চোখে মুখে।

সকাল বেলা টা খুব ব্যস্ত্য কাটে শায়লার। ফজরের নামাজ টা আদায় করে আর ঘুমায় না। টুকি টাকি কাজ সারতে থাকে। কখনো শুভর সাথে কথা হয়। তারপর ৭ টা বাজতেই আরি কে ঘুম ভাঙানো। নাস্তা সেরে ৮ টায় আরি কে স্কুল এ নামিয়ে, সোজা ছুটে অফিস এ। ফিরতে ফিরতে বিকাল ৫ টা। আরি কে আফটার স্কুল প্রোগ্রাম থেকে নিয়ে একবারে শায়লা বাড়ি ফিরে।

আজ ঘুম ভাঙতেই শুভর কল।
” উঠেছ? ” ঘুমন্ত জরানো কন্ঠ শুভর। শায়লাও জড়ানো গলায় বলল…
” হুম, এখনো বিছানা ছাড়িনি ”
” আরি ঘুমুচ্ছে ? ”
” হ্যা।”
হঠাত  কি যেন এক দুস্টুমি খেলে গেল শুভর মনে। বলল..
” আরি কে একটা আদর দাও আমার হয়ে ”
” হুম”  ঘুম জড়ানো কন্ঠে শায়লা বলল।
” আচ্ছা, আমি তুমাকে ছোট্ট একটা আদর দিচ্ছি, তুমি আরি কে ট্রান্সফার কর”। বলেই উচ্চ সুরে হেসে উঠল শুভ।
শায়লার মুখটি চট করে লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। ঘুম যেন মুহুরতেই ছুটে গেল।
” মারব ” বলেই ফোনটা নামিয়ে রাখল শায়লা।
বালিশ টায় মুখ গুজে ভাবছে শায়লা…..আচ্ছা, শুভর এই ছোট্ট ছোট্ট দুস্টুমি এত ভাল লাগে কেন!!
এর নাম কি প্রেম? নাকি এ শুধুই ভাললাগা!!!

আজ অফিস এ শুভ আসবে শায়লার সাথে লাঞ্চ করতে। অফিস এ সবায় মুটামুটি জানে ওদের সম্পরক টা। যথাসময়ে শুভ এসে হাজির। হাতে বিশাল খাবারের প্যাকেট। অফিস এর সবার জন্যেই অল্প কিচ্ছু নিয়ে এসেছে।
শায়লার রুমে ঢুকার মুখে বস এর সামনে পরল শুভ।
” এই যে মিস্টার শুভ, কেমন আছেন?” বলেই এক গাল হাসলেন বস।
” জি ভাল। আপনি? ” বলেই বিনম্র শুভ দরজার পাশেই দাড়িয়ে পরলো।
” আমি আর কি ভাল থাকব বলুন, বয়স হয়েছে যে ” বলেই বস হেহে করে হাসতে লাগলেন।
” কি যে বলেন সার, আপনি এখনো ইয়াং ” শুভ বলল।
” হে হে হে হাসালেন আমায় ইয়াং ম্যান। যাই হোক, আপনাদের বিয়েটা কবে খাচ্ছি তাই বলুন ”  আবারো বস এর হে হে হাসি।
একটু যেন অপ্রস্তুত দেখালো শুভ কে।
” জি, দোওয়া করবেন ইন শা আল্লাহ ”
বলেই শুভ পাশ কাটিয়ে শায়লার রুমে চলে গেল।
শুভ কে দেখেই শায়লার মুখে হাসি চলে এলো। আজ শায়লার সব পছন্দের খাবার নিয়ে এসেছে শুভ। এক এক করে সব ঢেলে প্ল্যাট এ সাঝিয়ে রাখল। দুজনে এক সাথে লাঞ্চ করলো। খাওয়া শেষে দুজনেই সোফায় গা এলিয়ে দিল।
আরি কে নিয়ে কথা হচ্ছিল। কথার এক ফাকে, শায়লার হাত টি হাতের মুঠোয় তুলে, আঙুল গুলো নিয়ে খেলতে লাগল শুভ। শিহরনে সারা গা কেপে উঠছিল শায়লার। তবু বাধা দিল।
” আহ! কি করছো? কেও আসবে “।
বলেই হাতটি ছাড়িয়ে নিতে চাইল শায়লা।
” একটু ছুয়ে থাকি নাহ ” বলে আরো শক্ত করে হাতটি ধরে রইল শুভ। আঙুল গুলো নাড়তে নাড়তে কথা বলছিল শুভ।
শায়লা তখন অন্য এক এক জগতে চলে এসেছে। জীবনে প্রথম কোন পুরুষের ভালবাসার ছুওয়া বুঝি এমনি উত্থাল পাতাল ঢেও তুলে কারো মনে! শায়লার ও ইচ্ছে করছিল তার বুকে মাথা রেখে পরম সান্তিতে নিজেকে বিলিয়ে দেয়।
কিন্তু…….চকিতেই এক রাশ পাপবোধ, ভয়, লজ্জা এসে জড়ো হল শায়লার চোখে।
নাহ! এ অন্যায়! এমন ভাবাও পাপ! নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে, শুভ কে বিদায় জানালো।

এমনি কঅরে, দিন যায় সপ্তাহ যায়, বছর যায়। ওদের সম্পরকের আজ দুবছর পেরোলো।
শুভ ও ততোদিনে এই লুকোচুরি খেলার ইতি টানতে ব্যাকুল হয়ে উঠল।

পরিবারের বড় ছেলে শুভ। ছোট্ট দুবোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বাবাও চলে গিয়েছে আজ কয়েক বছর। বৃদ্ধা মা একাকী থাকে। শুভ কে এবার ঘরে বউ আনতে তাড়া দিতে লাগল। বোনেরাও নাছোড় বান্দা। ভাই কে এবার বিয়ে দিতেই হবে। ইতিমধ্যে শায়লার ও ডিভোর্স হয়ে গেছে। শায়লা কে তাড়া দিতে শুরু করলো শুভ। প্রায়ই বিয়ের কথা বলতে লাগল।
শায়লা নিরুত্তর। কি করবে ভেবে পায়না। আরি এখন দশে পা দিয়েছে। এখনো জীবন  নিয়ে, সম্পরক নিয়ে ভাবতে শিখেনি। এখনো তার অবুঝ মন বার বার বাবা কে ডাকে। মামুনী কে ভাগ করার কথা ভাবতেই পারেনা। অন্য কাও কে মামুনীর পাশে দেখতে নারাজ। কি করবে শায়লা ভেবে পায়না।

এ যেন শায়লার দুঃখ ভরা জীবনে, আরেক টি নতুন দুঃখের সুচনা।

বিকট শব্দে ফোন টা বেজে উঠল। শুভর কল। কিছুটা অসস্থ্যি নিয়েই ফোন টা হাতে তুলে নিল শায়লা।
“শুভ বল ” বুকে চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো শায়লার।
” কি ভাবলে ” শুভর ক্লান্ত কন্ঠ টের পাচ্ছিল শায়লা।
” জানিনা ” শায়লার বুকটা দুরু দুরু কাপছিল।
শুভ যেন এবার হতাশ হল কিছুটা। বলল,
” তুমি কবে নাগাত বিয়ে করতে পারবে? ফ্যামিলী কে তো মানাতে পারছিনা শায়লা”
শায়লার নির্শ্বাস ভারি হয়ে এলো। জড়ানো কন্ঠে বললো,
” তুমি কি নিজেকে মানাতে পেরেছো আমার জীবন টার সাথে? ”
শুভ নিরুত্তর।
শায়লা এবার কান্নায় ভেঙে পরলো। বলল,
” তুমি তো সব জানতে শুভ। বলনি তুমি আমার জন্য এক যুগ কাটিয়ে দেবে পথে পথে? বলনি তুমি আমার পাশে আজীবন থাকবে সুখে দুঃখে? বলনি শুভ? ”
” বলেছি। হ্যা। কিন্তু এভাবে কতদিন শায়লা? ভালবাসি তুমায়। আপন করে পেতে চাই। একি আমার অপরাধ? ”
” নাহ। আমি কি করতে পারি? আমার আরি এখন ছোট্ট। ও মেনে নিবেনা”।
আবারো শায়লা কান্নায় ভেঙে পরে।
” আমি বুঝি শায়লা। বল তুমি কবে সমস্ত দায়িত্ত থেকে মুক্ত হবে। এক বছর, দু বছর, ৫ বছর? আমি অপেক্ষা করবো। কিন্তু এভাবে ঝুলে থাকা যায়না। আমার পরিবার মানবেনা।  বৃদ্ধা মা এর সান্তি দেখা কি আমার অপরাধ? আজ কথা দাও। নয়তো আমাকে ঘরে বউ তুলতে হবে শীঘ্রই। মা আর মানছেন না কিছুতেই ।”
এক নিশ্বাসে কথা গুলো বলেই হাপিয়ে উঠল শুভ।
শায়লা অনড়। তার শরীর কাপছিল। কিছুটা যন্ত্রনা মেশানো কন্ঠে বলল,
” আমি কথা দিতে পারছিনা। আমি সময় বেধে দিতে পারছিনা শুভ। আমি সময়ের হাতে বন্ধি। আমি জানিনা কাল কি হবে! যদি আমার আরি মেনে না নেয়! যদি এক যুগ লেগে যায় তুমার ঘরনী হতে! আমার এই অনিশ্চিত জীবনে, তুমায় নিশ্চয়তা দেই কি করে শুভ!! ”
বলেই ফোন টা কেটে দিল।
থরথর করে কাপছিল শায়লা। শুভ কে ভালবাসে সে। হারাতে চায় না। কিন্তু……
আজ শায়লা কাঁদবে । রাতভর কেঁদে বুক ভাসাবে । শুভ কে সে কি বলবে ? কি দিয়ে আটকাবে ?

কিছুটা অভিমান, কিছুটা অপারগতা মিলিয়ে আর কল করেনি শুভ কে। সেই ছিল শুভর সাথে শায়লার শেষ কথা।
শুভ ও আর কোনদিন খোজ করেনি শায়লার। শায়লা আজো জানেনা, শুভ কেমন আছে, কোথায় আছে! কত মাস, কত বছর কেটে গেল। অভিমানী শায়লা খোজ করেনি শুভর।

আরি বড় হয়েছে। পড়াশুনা করতে বিদেশ গিয়েছে।
শায়লা একা। আজো সেই চিরাচরিত নিয়মে ঘুম ভাঙে শায়লার প্রতি ভোরে। এখন আর শুভর কল আসেনা। চল্লিশোরধ  শায়লা একি নিয়মে ছোটে অফিস এ। সন্ধে মূখে, ক্লান্ত শরীর টা হেলিয়ে দেয় ইজি চেয়ারে। তারপর এক রাশ নিঃসঙ্গতা ছেয়ে যায় শায়লার চোখে মুখে।

শায়লাদের মত নারীদের সপ্ন দেখতে নেই। শায়লারা কারো ঘর উজ্জল করতে জন্মায়নি। শায়লাদের জীবন সময়ের কাছে পরাজিত। সমাজ, সংসার আর দায়িত্তের কাছে পরাজিত। শায়লা ভাবে, একজন আদর্শ স্ত্রী হতে পারিনি, একজন ভাল প্রেমিকা হতে পারিনি, একজন ভাল মা তো হয়েছি!!
আবারো শায়লার চোখ ভিঝে উঠে। এভাবেই চলে শায়লাদের জীবন !!