রানুর ইতিকথা- পর্ব ১-৬

10985367_663379843784613_4997060656625748259_n

 

ছোট গল্প

——————– ডার্ক এভিল ।

রানুর ইতিকথা!

পর্ব ১ ****************

আষাঢ় মাসের দুপুর গড়িয়ে বিকেল প্রায়। এ সময় সাধারনত আকাশ মেঘলা থাকারই কথা। কিন্তু এখন ঝুম বৃস্টি হচ্ছে। বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে রায়হান সাহেব বগলের তলে রাখা ছাতাটা মেলে ধরলেন মাথার উপর। আরেক হাতে তার বাজারের ব্যাগ। পায়জামাটা হাটুর কাছে ভাঁজ করে তুলেই তিনি ছপ ছপ পায়ে এগিয়ে যেতে লাগলেন মেইন ফটকের দিকে।
মনে মনে ভাবছেন, আজ কি বাজার করা যায় ! প্রায় ৮ বছর পর আজ তার বড় মেয়ে বীথি এসেছে বিদেশ থেকে। সাথে জামাই ও দুই ছেলে মেয়ে ছোটন এবং সুরেলা । বৃস্টির দিনে বীথি ভুনা খিচুরী আর গরুর মাংস খুব পছন্দ করতো। তাহলে সেটাই নেয়া যাক।
কিন্তু যদি মেয়ের শখ এতদিনে বদলে গিয়ে থাকে ! কে যানে ! হয়তো এখন ভুনা খিচুরী আর গরুর মাংসের বদলে,বৃস্টির দিনে মেয়ে সী-ওইড কিংবা আফ্রিকান লাং ফিশ খেতেই বেশী পছন্দ করেন !
রায়হান সাহেব এর কপালে আরেকটা বিরক্তির ছাপ পরলো। নিজ মনে বিড়বিড় করতে করতেই তিনি বাজারের দিকে ছুটলেন।
রায়হান মুস্তফা। একজন অবসর প্রাপ্ত সরকারী ব্যাংক কর্মকর্তা। ৩ মেয়ে বীথি, প্রীতি ও রানু।
কোন ছেলে সন্তান নেই উনার। স্ত্রী রাহেলা খাতুন । কিছুটা ওজনদার হলেও অত্যন্ত দায়ীত্বশীলা ও মায়াবী মনের একজন স্ত্রী রাহেলা। ৩ মেয়েকে বলতে গেলে রাহেলা খাতুনই আদর যত্ন ও শাসনে রেখে মানুষ করেছেন। যদিও ৩ মেয়েই আড়ালে বাবার বেশী ভক্ত !
রায়হান সাহেবের ৩ মেয়েই অসম্ভব রুপবতী ।এইচ এস সি পাশ করার পরই বীথির বিয়ে হয়ে যায়। স্বামী মন্জুরুল হক , বড় সাদাসিধা ঘরকুণো টাইপ ভদ্রলোক ।
প্রীতি, রায়হান সাহেব ডাকেন প্রীতিলতা বলে, বাকহীন বধীর বলে স্কুলের চৌকাঠ মাড়ানো হয়নি ! অথচ এই মেয়েটিই রায়হান সাহেবের সব চেয়ে রুপবতী ও গুনবতী ।
সবার ছোট রানু । অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী । ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইকোনমিকসে অনার্স করছে! ফাইনাল ইয়ার ।
চাকুরী থেকে অবসর নেয়ার পর, পেনশন এর টাকা ও বাড়ী ভাড়া দিয়েই রায়হান সাহেবের সংসার চলে যায়। একতলা ও দুইতলা ভাড়া দেয়া। নিজেরা থাকেন তিন তলায়।
আর সময়ে অসময়ে এমেরিকা প্রবাসী মেয়ে বীথি তো আছেই !

*******************
আজ ভুনা খিচুরী আর গরুর মাংস রান্না করেছেন রাহেলা খাতুন। কতদিন পর ৩ মেয়েকে এক সাথে নিজ হারে বেরে খাওয়াচ্ছেন । মঞ্জুরুক কে একটু বেশীই সমাদর করে খাওয়ানো হচ্ছে। জামাই বলে কথা! বীথি গরগর করে অনর্গল তার এমেরিকার গল্প করেই যাচ্ছে। রাহেলা খাতুন এর এই মেয়েটি একটু বোকা টাইপের। অসম্ভব সুন্দরী মেয়ে গুলো বোকাই হয় ।
ছোটন আর সুরেলা বসেছে রানুর দু’পাশে ।পরম আদরে রানু ওদের মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে।
রাহেলা খাতুন হঠাত লক্ষ্য করলেন, প্রীতি কেবল তার পাতের খাবার নেড়ে চেড়েই যাচ্ছে। মুখে দিচ্ছেনা।
-কি রে মা, খাচ্ছিস না যে ! ভাল হয়নি বুঝি ? বলেই রাহেলা খাতুন এগিয়ে গেলেন প্রীতির দিকে।
প্রীতি মাথা ঝাকিয়ে জানালো যে খাবার ভাল হয়েছে। তারপর এক হাতে মা এর কোমর জড়িয়ে ধরেই আস্তে আস্তে খেতে লাগলো। যেন মা কে ছুঁয়ে খুব অসস্থিকর কিছু একটা থেকে মুক্তি পেলো প্রীতি ।
ঝুম বৃস্টির সাথে যোগ হয়েছে আজ বিজলী চমকানো। ছোটন আর সুরেলা তো ভয়ে অস্থির। বীথি বাচ্ছাদের পাঠিয়ে দিলো বাবার ঘরে। আজ শুধু ৩ বোন গলা জড়িয়ে গল্প করবে।

*******************
এক খাটে ৩ বোন। বীথির কোলে মাথা রেখে প্রীতি শুয়েছে। রানু তার গাল টা আলতো ছুঁয়ে প্রীতির পা জড়িয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে বীথির কথা শুনছে । বীথি, প্রীতির চুল গুলো টেনে দিচ্ছিলো।
রাহেলা খাতুন এসে দরজায় টোকা দিলেন।
-ভিতরে এসো মা। বলল বীথি।
রাহেলা খাতুন ঢুকলেন । মেয়েদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
– চা খাবি নাকি রে মা? খাঁটি গাইয়ের দুধের চা।
প্রীতি মাথা ঝাকিয়ে জানালো সে খাবে। বীথি বলল ,
-নিয়ে এসো মা। ৪ কাপ চা। তুমিও আমাদের সাথে খাবে আর গল্প করবে।
রাহেলা খাতুন চলে গেলেন চা বানাতে।
রানু হঠাত জিজ্ঞেস করলো,
-আচ্ছা আপু, দুলাভাই রাগ করবেনা তুমি যে উনাকে একা ফেলে আমাদের সাথে গল্প করছো?
বীথি কিছুটা বিরক্তি সুরেই বলল ,
– করুক। ৮ বছর গায়ে গায়ে লেগে ছিলাম। উফফ !!!
রানুর চোখে মুখে দুস্টুমী খেলে গেলো। আরেকটু কাছে বীথির গা ঘেঁসেই জিজ্ঞেস করল,
– দুলাভাই কি খুব বউখেকো নাকি আপু ?
বীথির চোখ গোল হয়ে গেলো। ছোট থেকেই কোন এক বিশেষ কারনে, অবাক হওয়ার মত কিছু ঘটলেই বীথির চোখ গোল হয়ে যায়।
– বউখেকো কি? গোল গোল চোখে বীথির প্রশ্ন।
– বউখেকো হচ্ছে যারা বউ বউ করে দিন রাত বউ এর আঁচল ধরে রাখে। অতি ভালবাসা বিলাতে গিয়ে বউ কে জেইল খানার কয়েদী বানিয়ে দেয়। একটা নির্দিস্ট বৃত্তের বাহিরে সেই বউ পা বাড়াতে পারেনা। সেই বউ এর কাজ হচ্ছে, দিন রাত শুধু স্বামীর গদ্গদ ভালবাসা দেখে লজ্জায় লাল, নীল, হলদে রঙ ধরা। ভ্যানেটি ব্যাগের মত সেই স্বামীকে ডান হাতে ঝুলিয়ে হেলে দুলে হাটা।
প্রীতি খিক করে হেসে উঠলো। বীথির চোখ আরো গোল হয়ে গেলো। বলে কি এই মেয়ে !!
– তুই তো খুব বেশী পেকে গেছিস রে রানু ! বলেই আবার বীথির চোখ গোল হয়ে গেলো।
– হি হি হি । এটাকে পাকা বলেনা আপু। এটা হচ্ছে পেকে পেকে ঝাঞ্জুরা হয়ে যাওয়া । অনেক টা সবুজ থেকে বাদামী বর্ন ধারন করা নারিকেল এর মত। বলেই আবার হাসতে লাগলো রানু।
রাহেলা বেগম চা এর ট্রে হাতে এসে ঘরে ঢুকলেন।

***********************************************************************************************
রানুর ইতিকথা ! ( পর্ব ২ )
*****************
আজ দিন টা ফুরফুরা। কিছুটা রোদের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে। সেই সাথে শীতল বাতাস। দক্ষিনের বারান্দায় প্রীতি সুঁই সুতোয় এফোড় ওফোড় করে নকশী কাঁথা করছে। বীথি কে দেবে বলেই গত ১ মাস ধরে কাঁথা নিয়ে বসেছে মেয়েটা।
৩ মেয়ে থেকে, প্রারীতিলতার প্রতি রায়হান সাহেবের মমতা যেন একটু বেশীই। হয়তো বধীর বলেই !
এক কাপ চা হাতে রায়হান সাহেব এগিয়ে গেলেন মেয়ের দিকে।
– কিরে মা ! চা খাবি ? বলেই মেয়ের মাথায় পরম যত্নে হাত বুলালেন।
ঘার নেড়ে প্রীতি জানালো খাবে। রায়হান সাহেব মেয়ের হাতে নিজের চা এর কাপ তুলে দিয়ে পাশে বসলেন । প্রীতি চা এ চুমুক দিয়ে বাবার দিকে তাকালো। হয়তো বুঝতে পেরেছে এতক্ষনে যে বাবা না খেয়ে তার ভাগের চা দিয়ে দিয়েছেন মেয়েকে।
প্রীতি দু চুমুক দিয়েই চা এর কাপ বাবার দিকে এগিয়ে দিলো। ইশারায় বুঝালো যে বাকিটা বাবার জন্য।
রায়হান সাহেবের চোখ ভিজে এলো। মেয়েটা এত মায়াবতী হয়েছে ! এত ভালো একটা মেয়ের মুখে বাবা ডাক শুনতে কার না ইচ্ছে করে ! রায়হান সাহেব অশ্রুভেজা চোখে মেয়ের পাশ থেকে সরে এলেন।
বারান্দার কোনায় রাখা তার ইজি চেয়ারটাতে গা এলিয়ে দিলেন। ভাবতে লাগলেন ! মেয়েটার বয়স প্রায় ২৬ ছুঁই ছুঁই । ছোট মেয়ে রানুর জন্য বিয়ের সমন্দ্ব আসছে। কিন্তু প্রীতিকে রেখে দেয় কি করে ! মেয়েটা কে একটা বিয়ে দিতে পারলে যেন শান্তিতে মরতে পারতো। কিন্তু করবে কে ? মেয়ে যে বাকহীন বধীর ! এমন ভালো একটা মেয়ে তার। তার বিয়ে হবেনা ! কেউ তাকে ভালবেসে খুপায় ফুল গুঁজে দিবেনা ! যদি তিনি না থাকেন, তাহলে মেয়েটার কি হবে ! এসব নানান ভাবনায় রায়হান সাহেবের চোখ জলে ভরে এলো।

*****************
সুরেলা আর ছোটন রানুর সাথে বিছানায় শুয়ে কার্টুন দেখছে। এমন সময় রাহেলা খাতুন শাড়ীর আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এসে ঘরে ঢুকলেন ।
– কি দেখছিস রে তোরা? খাটে বসেই রাহেলা খাতুন জিজ্ঞেস করলেন।
– কার্টুন মা। রানু বলল ।
– বাংলা চ্যানেলটা ধর না রে মা।
মা ক্যা অস্বীকার করার উপায় নেই রানুর। সারাদিনের কর্মব্যাস্ততার পর, ঘন্টা খানেক বাংলা টিভি না দেখলে রাহেলা খাতুনের ঘুম হয়না। অগত্যা চ্যানেল বদলে দিল রানু। সুরেলা আর ছোটন যেন কিছুটা অবাক হলো। দুই ভাই বোন একে অন্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। রানু জিজ্ঞেস করলো,
– হোয়াট ইজ দ্যা ঘটনা ? বলেই রহস্য করে তাকালো ভাগ্না/ভাগ্নির দিকে।
– ইউ ডিড নট এভেন এস্ক আস বিফোর ইউ চেঞ্জ দ্যা চ্যানেল ! বলেই মুখ বাঁকা করলো সুরেলা।
– সরি জান্টুমনি ! মাই মিস্টেইক। এইবারের মত এক্সকিজ মি প্লিজ ! বলেই রানু সুরেলা আর ছোটন কে কাতুকুতু দিতে লাগলো । ওরা খিল খিল করে হেসে উঠলো।
রাহেলা খাতুন এর মুখ হা হয়ে আছে।
– একি ! বড়রা চ্যানেল বদলাবে। তাতে সরি বলার কি আছে ! বলেই রানুর দিকে অবাক চোখে তাকালেন। রানু বলল,
– এটাই এমেরিকানদের নিয়ম। মা, তুমিও সরি বলো।
– আমি এই পিচ্ছিদের কেন সরি বলবো ? কি করেছি আমি ? বলেই রাহেলা খাতুন বিস্মিত চোখে একবার নাতিনাতনি , আরেকবার মেয়ের মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন ।
– তুমি বিরাট এক অন্যায় করেছো। টিভির চ্যানেল বদলানোর আগে ওদের পার্মিশন নাওনি। ওদের বলো ” সরি ছোটন সোনা। সরি সুরেলা ময়না”।
– সরি ছোটন সোনা। সরি সুরেলা ময়না। চোখের পলক না ফেলেই রাহেলা খাতুন মেয়ের শিখিয়ে দেওয়া লাইন টা বলে ফেললেন ।
– ইটস ওকে গ্র্যান্ডমা। ছোটন ও সুরেলা দু’জনেই বলল ।
রাহেলা খাতুনের বিস্ময় যেন কাটছেনা। অবিশ্বাস্য চোখে টিভির দিকে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছেন।
এমেরিকানদের সাথে বাঙ্গালী পরিবারের সদস্যদের প্রায়ই কিছু প্রথা ও ভদ্রতার সংঘর্শ ঘটে। যেমন রাহেলা খাতুন ভাবছেন, বড়রা যখন খুশী সিদ্বান্ত নিবেন। তাতে ছোটদের পার্মিশন লাগবে কেন? এমেরিকায় ভিন্ন ব্যাবস্থা। সেখানে যে কোন বিষয়ে, ছোটদের ও প্রাধান্য দেওয়া হয়। ওরা মনে করেন, ছোটদের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হলে, তাদের আত্ববিশ্বাস ও মনোবল কে জোড়দার করা হয়। ছোট থেকেই প্রতিটি শিশুর আত্ববিশ্বাস ও মনোবল বৃদ্বি না করলে, বড় হয়ে সে অকর্ম্য হয়। জীবনে সাফল্য আনতে পারেনা।
ততক্ষনে রাহেলা খাতুন বাংলা ছবি দেখা শুরু করেছেন। ছবির নাম স্বামী কেন আসামী। কলকাতার ঋতুপর্না সেন দারুন উদ্দীপনায় গানের সাথে নেচে যাচ্ছেন। রাহেলা খাতুন গভীর মনোযোগ প্রদর্শন করে দেখছেন।
– হোয়াই দে আর থ্রোয়িং দেয়ার আর্মস এন্ড ল্যাগস টু ইচ আদার ? দাদীমা কে প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়ে আবার টিভির দিকে তাকাল সুরেলা। রাহেলা খাতুন বুঝতে না পেরে রানুর দিকে তাকালেন। রানু বলল ,
– ওদের শরীরে এলার্জী হয়েছে। গা চুলকাচ্ছে । তাই এমন অস্থির ভাবে হাত পা ছুড়ছে সোনা ।
– হি হি হি । সুরেলা যেন খুব মজা পেলো।
এবার যেন রাহেলা খাতুন বুঝতে পারলেন । বিরক্তিতে মেয়ের দিকে তাকালেন। এমন বেয়াদপ মেয়ে তার ঘরে জন্মালো কি করে !

******************
মঞ্জুরুল হক খাটে হেলান দিয়ে গভীর মনোযোগে ম্যাগাজিন পরছেন। বীথি ড্রেইসিং টেবিল এ তার চুল ঠিক করায় ব্যাস্ত। আড়চোখে স্বামীকে একবার দেখে নিলো বীথি।
– এই শোনো। ডাকলো বীথি।
– হুম। ম্যাগাজিন থেকে চোখ না তুলেই উত্তর দিলো সে।
– বাবা বলছিলেন গ্রামে আমাদের বাগান বাড়ীতে নিয়ে যাবে। সকালে যাবো। রাতের মদ্ধেই ফিরবো। কি বলো?
-অজপারা গায়ে আমার যেতে ভালো লাগেনা। তোমরা যাও না প্লিজ ! আমি বাসায় থাকি।
– বাবা কি মনে করবেন তুমি না গেলে?
– বাবাকে বুঝিয়ে বলো সোনা ! বলেই মঞ্জুরুল হক উঠে গিয়ে বীথির কোমর জড়িয়ে ধরলেন।
– আহ ! হচ্ছে কি এসব ! ছাড়ো ! কেউ এসে পরবে। বলেই বীথি নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো।
এমন সময় রানু দরজায় টোকা দিয়ে বললো,
– আসবো ভিতরে আপু?
– আয়। বলেই কাপরটা ঠিক করে নিলো বীথি।
রানু ট্রে তে করে দুটো পায়েস এর বাটি নিয়ে ঘরে ঢুকলো। বীথি কে এক বাটি হাতে দিয়ে আরেক বাটি দুলাভাইয়ের হাতে দিয়ে বিছানায় বসলো।
– কি শালীকা ! কাল নাকি বাগান বাড়ী যাচ্ছো? ম্যাগাজিন থেকে চোখ না তুলেই মঞ্জুরুল হক জিজ্ঞেস করলেন।
– হুম যাচ্ছি। আপনি যাবেন না ?
– নাহ। আমার কিছু প্রজেক্টের কাজ বাকি আছে। সেগুলো শেষ করে ওদের সাবমিট করতে হবে মেইল এ। তোমরা এঞ্জয় করো।
– ওহ। বলেই রানু উঠে দাড়ালো। বীথি পায়েস খাচ্ছিলো। রানুকে যেতে দেখেই জিজ্ঞেস করলো,
– কি রে ! প্রীতির কি মাথা ব্যাথা কমেছে?
– নাহ । বললো রানু ।
– তাহলে?
– তাহলে কি ? রানুর দৃস্টিতে প্রশ্ন।
– তাহলে কাল কি বাগান বারী যাওয়া হবেনা?
– ওর শরীর ভালো না হলে কি করে যাই? বললো রানু ।
– এক কাজ করা যায়। রাতারাতি প্রীতি সেরে উঠলে তো ভালই। আর না হলে, চিন্তার কিছু নাই। তোর দুলাভাই যাচ্ছেনা। প্রীতিকে দেখে রাখতে পারবে। আমরা তো রাতের আগে চলেই আসছি। বৃস্টি বাদলার দিন। কখন আবার আবহাওয়া খারাপ করে !
বলেই বীথি হাসলো। যেন বিশাল এক সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে।
– দেখা যাক। হয়তো সকালের মধ্যে সেরে উঠবে। বলেই রানু ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। যেতে যেতে ভাবলো, আসলেই সুন্দরী মেয়ে গুলো বোকা। শুধু বোকা না, ওরা যে গৃহপালিত প্রানীর মত অনুগতও সেটা বীথিকে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবেনা !!

******************
সবাই খুব সেজেগুঁজে আছে বাগান বাড়ী যাবে বলে। বীথি পরেছে লালের উপর সবুজ পাড়ের শাড়ী। সুরেলা, ছোটন কে সকাল সকাল গোসল দেওয়া হয়েছে। মঞ্জুরুল হক তখনো আধাশোয়া হয়ে বিছানায় খবর দেখছেন টিভিতে। এই নিয়ে ৩ বার বীথি শাড়ীর আঁচল ঠিক করতে রানুর কাছে এলো।
– আঁচলটা এমন হয়ে আছে কেন রে রানু ! দেখ তো আবার একটু ঠিক করে দে।
রানুর বিরক্তি এবার চরমে।
– আপু তোকে আজ বাংলাদেশের জাতীয় পতার মত লাগছে। শাড়ীর আঁচল ঠিক করতে করতে বললো রানু।
– মানে কি ! অবাক হয়ে বীথি প্রশ্ন করলো।
– মানে কিছু না। মানে হলো তুই খুব ভালো একজন মানুষ। এত ভালো যে, মাঝে মাঝে তোকে নিয়ে কষ্ট হয়।
বলেই রানু শাড়ির আঁচল ছেড়ে মা এর ঘরের দিকে পা বাড়ালো। বীথি কিছুই বুঝতে না পেরে হা করে দাঁড়িয়ে রইলো।
রাহেলা খাতুন অতি ব্যাস্ত গাড়ীতে প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র তুলায়। ছোটন আর সুরেলা ইতিমধ্যে গাড়ীতে উঠে পরেছে। বাংলার পতাকা গায়ে বীথি বার বার হোচট খাচ্ছে। শাড়ী পরার অভ্যাস নেই বলেই অসস্থিকর পরিস্থিতিতে পরছে বার বার।
চিন্তিত মুখে রায়হান সাহেব প্রীতির মাথায় হাত রেখে পাশে বসে আছেন। গত দুইদিন মেয়েটা মাইগ্রেনের ব্যাথায় খুব কষ্ট পেয়েছে। সাথে বমিও হচ্ছিল। আজ ব্যাথা কিছুটা কমেছে তবে শরীর খুব দুর্বল। মেয়েটাকে এভাবে ফেলে যেতে রায়হান সাহেবের মন সায় দিচ্ছেনা।মন্জুরুল হক অবশ্য আছেন বলেই প্রীতিকে রেখে যেতে ভরশা পাচ্ছেন! তাছাড়া কাজের বুয়াকেও বলা আছে প্রীতির সাথে থাকার জন্য।
প্রীতি ঘুমিয়ে পরেছে। বুয়াকে পাশে বসিয়ে রায়হান সাহেব বেরিয়ে পরলেন ।

*****************
গাড়ী ছুটে চলেছে বাগান বাড়ীর পথে শহর পেরিয়ে গ্রামে। বাচ্চারা খুব উৎসাহ নিয়ে পথের ধারে এটা ওটা দেখছে। সব কিছুতেই তাদের প্রশ্ন ।
রানু গাড়ীর জানালয় মুখ বের করে আছে। তার শীতল দৃষ্টি যেন আকাশের স্থিরতাকেও হার মানাচ্ছে!
কি যেন এক অস্বস্থিবোধ তাকে ঘিরে ধরেছে !
রায়হান সাহেব লক্ষ্য করলেন। মেয়ের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
-কি রে রানু! প্রীতির জন্য ভাবছিস বুঝি ?
আশ্চর্য্য ! বাবা কি করে বুজলেন ! মাও কখনো এতটা মনের গভীরে পৌছাতে পারেননি আজ পর্যন্ত! কিন্তু প্রতিবার, মনের প্রতিটা উৎকন্ঠা বাবা কি করে টের পান ! ভাবতে ভাবতে রানু বাবার দিকে ফিরে তাকালো।
– বাবা, তুমি যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবাদের একজন, তা কি জানো ?
– নাহ ! জানতাম না ! আজ জানলাম !
বলেই রায়হান সাহেব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।

***********************************************************************************************
রানুর ইতিকথা ! ( পর্ব ৩)
***************
কোথায় যে যায় ! ক্ষুদ্র ফুল , বৃহৎ পৃথিবী, নীলিমায় নীল আকাস…আর ওই কুহেলিকা ঘেরা কানন, দুঃখবিলাসী রানুর ছায়া তিলেক বিরহে ছুটে তেপান্তরের মাঠে। মাঠ ভরা হরিনের দল ছুটে তার চোখের জমিনে। নিকশ আঁধারে জ্বোনাকীর আলোয় প্রস্ফুটিত চাঁদমুখে,গালে চিকচিক করা অবৈধ সঙ্গী অশ্রুবিন্দু ! কালজয়ী সঙ্গীতে সুর মিলাতে মিলাতে বড্ড ক্লান্ত লাগে আজ রানুর ! রাত জাগা নৈশব্দের সাক্ষী ওই দুরন্ত প্রহেলিকা খুঁটে খুঁটে খায় রানুর বিবেককে ! অন্তরদাহে বৃষ্টির ছমছম শব্দ আর বাতাসে পাতার শব্দ মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় !
শ্বাশত চির সত্য যা, তবু মর্ম বেদনায় প্রান কাঁপে কেন আজ ! কেন যে মেনে নেয়া যায়না ! ফেলে দেওয়া যায়না ! ভালবাসা, বন্দ্বন বুঝি এটাই ! ভাবতে ভাবতে রানুর চোখ জলে ভরে এলো।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জ্বানালার পাশ থেকে সরে এলো রানু। বিছানায় আধাশোয়া হয়ে শুয়ে গায়ের উপর কাঁথাটা টেনে দিল। পাশে রাখা বইয়ের মলাটের ভিতর থেকে চিঠিটা বের করে চোখ বুলিয়ে যেতে লাগলো। ছোট একটা চিঠি । কয়েকটা লাইন মাত্র। অথচ কি অদ্ভুত এক যাতনা মিশে আছে চিঠিটাতে ! যতবার পড়ে, ততবারই রানুর বুকে কি যেন এক অসীম শুন্যতা টের পায় ! আবারো চিঠিটা পড়তে লাগলো রানু।
রানু,
কি দিয়ে ভালবাসা জানাই ? বুঝতে পারছিনা। তাই তোমার শুভ্র ললাটে শুধুমাত্র একটু হাত রেখে গেলাম।
জানি তুমি বড্ড জেদী। তোমাকে নোয়ানো সম্ভব নয়। আমি অপেক্ষা করবো। তবু তুমি এসো। কোন এক শরতের আকাসের শুভ্র স্বচ্ছ বালিহাস কিংবা বর্ষার আকাসের মেঘমালা হয়ে এসো। বেলা শেষে অবেলার সাক্ষি হয়েই না হয় এসো। যদি মন কাঁদে একাকী তবে চলে এসো বৃস্টির কোন এক সন্দ্ব্যায়। ভুল করে ভুল ক্ষনেই না হয় চলে এসো। সময়কে হাতের মুঠোয় বন্দ্বি করে চির সবুজের গায়ে লেগে থাকা শিশির বিন্দুর মতই আমি তোমার অপেক্ষায়…………।
ইতি,
শুভদা !

******************
প্রীতির প্রতি রানুর ভালবাসার কমতি নেই। সুযোগ পেলেই রানু দিনের অনেকটা সময় প্রীতির সাথে কাটায়। দুই বোন মিলে কি যেন ছাই পাশ করে। হেসে কুটি কুটি হয়। রাহেলা খাতুন তার কিছুই বুঝতে পারেন না। তবে ভালো লাগে। মাঝে মাঝে চোখ জলে ভরে উঠে। আল্লাহ পাকের কাছে দুই হাত তুলে শুক্রিয়া জানান তার ছোট কুড়েঘরটিকে ভালবাসায় ভরে দেয়ার জন্য।
তবু মনে দুশ্চিন্তা আসে। প্রীতির জন্য আসে। রানুর জন্য আসে।
গত মাসে একটা ভাল সমন্দ্ব এসেছে রানুর। ছেলে নিউ জার্সিতে একটা কলেজ এ শিক্ষকতা করেন। এক মায়ের এক ছেলে। কিন্তু রানু কে রাজি করাবে কে ! বড্ড জেদী মেয়েটা। তার উপর বাব তো আছেনই সোহাগ দিয়ে মেয়েকে আরো মাথায় তুলতে !
বীথি তার পরিবার নিয়ে বাহিরে শপিং এ বেরিয়েছে। প্রীতিও সাথে গেছে। রায়হান সাহেব বসে আছেন তার প্রিয় ইজি চেয়ারটায় দুইদিন পুরানো খবরের কাগজ হাতে নিয়ে। সময় পেলেই তিনি পুরানো খবর ঘাটেন। কেন ? তার রহস্য আজো খুজে পাননি রাহেলা খাতুন।
রানু অন্ধকার ঘরে শুয়ে রবীন্দ্র সংগীত শুনছে । রাহেলা খাতুন ঘরের বাতিটা জালিয়ে দিলেন।
– কিরে মা ! অবেলায় শুয়ে আছিস যে ! বলেই তিনি মেয়ের বিছানায় বসলেন
– এমনি মা। রানু মা এর কোমর জড়িয়ে ধরলো।
-একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম রে মা ! রাহেলা খাতুন ইতস্তত ভাবে রানুর মুখের দিকে তাকালেন।
– হুম বলে ফেলো। তখনো রানু মা এর কোমর জড়িয়ে আছে।
– বিয়ের ব্যাপারে কিছু ভেবেছিস? সমন্দ্বটা হাত ছাড়া হয়ে গেলে… !!!
রাহেলা খাতুন আর এগুলেন না। এখানেই থেমে গেলেন। ততক্ষনে রানু উঠে বসেছে।
– মা ! আমি তো বিয়ে করবোনা । জানো তুমি। তবে কেন একি কথা নিয়ে আবারো……… !
কথাটা শেষ না করেই থেমে গেলো রানু।
– এটা কি হয় রে রানু ?
– হয়। খুব হয়। আমাকে নিয়ে ভাবতে হবেনা। আমি আর প্রীতি দুই বোন এক সাথে থাকবো সারা জীবন।
– একদিন আমরা থাকবোনা রে মা। মেয়েদের একটা ঘরের প্রয়োজন হয়। একা থাকা যায় না। অসহায় চোখে রাহেলা খাতুন তাকালেন মেয়ের দিকে।
– কেন? একা কেন? আমি আর প্রীতি। দুই বোন আছি নাহ ! আমি চলে গেলে প্রীতির কি হবে। একদিন তোমরা থাকবেনা। সেদিন আমি আর প্রীতি, দুই বোন মিলে এক সাথে ঘুরে বেরাবো। সন্দ্ব্যার মুখে আমাদের বারান্দায় বসে চা খাবো আর তোমাদের ছবি দেখব এ্যালবাম মেলে।
– দুই দুইটা উপযুক্ত মেয়েকে এভাবে রেখে যাবো ! রাহেলার মুখে অসহায়ত্ব এবার স্পষ্ট ।
– হুম রেখে যাবা। বলেই রানু আবার রবীন্দ্র সংগীত টা ছেড়ে দিলো।
রাহেলা খাতুন এবার উঠে দাড়ালেন।

******************
সময় প্রবাহমান। নিজের গতিতে চলতেই থাকে। মানুষ ও সেই সময়ের সাথে ভেশে যায় এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে। পিছনে ফেলে যায় কিছু সুখ, দুঃখতি বিজরিত মুহুর্ত। প্রতিদিন আমাদের এই বেচে থাকার লড়াই প্রকৃতির সাথে, সমাজের সাথে, পাওয়া না পাওয়া আর মিথ্যা ও সমঝোতার সাথে।
জিবনের বাস্তবতা বড় কঠিন। মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী চলেনা। একেক সময়, একেক দিকে এঁকে বেঁকে চলে। নদীর স্রোত কে যেমন নিয়ন্ত্রন করা যায়না, জীবনের গতিকেও নিয়ন্ত্রন করা যায়না। আমরা অনেক সময়, নিজের জন্যই কেবল বেঁচে থাকি। কিছুটা স্বার্থপর এর মত। আমি কি চেয়েছি , আমি কি পেয়েছি… সেটাই যেন মুখ্য বিষয়। কখনো কখনো আমরা পৃথিবীর সমস্ত শক্তি দিয়েও মনের অবাধ বিচরণকে স্থির করতে পারিনা। অনেক অসম্ভব চলাচলকেও পৃথিবীর মানুষ স্থির করতে সক্ষম হয়েছে। শুধু পারেনি কল্পনার সাগরে মানুষের মনের অবাধ বিচরণকে স্থির করতে।
মায়া ভয়ংকর এক পিছুটান। এক অসীম দায়ীত্ব। এই ক্ষুদাতুর দুনিয়ায় এক পাল শকুনের মুখে প্রীতিকে একা ছড়ে দেয় কি করে রানু ! এখানে প্রতি মুহুর্তে মানুষ একে অন্যকে ছিড়ে খায়। এখানে পথে পথে অসহায়ত্ব কাঁদে । রাতের আঁধারে অমানুষ গুলো কেমন দিশেহারা পায়ে হেটে বেড়ায়। স্ব-জাতীয় দেহ পেলেই ছিন্ন ভিন্ন করে খুবলে খায়।
প্রীতিলতা এদের জিবে লালা জড়ানোর মতই এক সুস্বাদু খাদ্য বটে !!!
মানুষের কিছু কিছু কথা থাকে, কিছু আবেগমাখা দুঃখ থাকে। যা কখনো সে অন্যকে জানায় না ।পারলে আড়াল থেকেও সেইসব দুঃখকে আড়াল করে সে। এই কঠোর কষ্ট গোপনের পন্থা তার ব্যাক্তিত্বকে টিকিয়ে রাখে হয়তো কিন্তু তার ভেতরটা ধীরে ধীরে মরে যায়। এই স্বল্প পরিসরে কত কি যে দেখেছে রানু ! কত জোড়া চোখ যে তাক হয়ে আছে এই বধীর বোনটির দিকে। মাঝে মাঝে প্রচন্ড ভয়ে রানু কুঁকড়ে যায়। মনে হয় কোথায় যে যায় ! কোথায় যে লুকিয়ে রাখে প্রীতিকে!

***********************************************************************************************
রানুর ইতিকথা! ( পর্ব ৪ )

******************
বর্ষা পেরিয়ে শরতের শুরু। প্রকৃতি অনেকটাই শান্ত শীতল। চারিদিকে সবুজের সমারোহ । মাঝে মাঝে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে! ভোরের শিশির ভেজা ধান, শিউলী ফুল, কোমল রোদে পুকুরে ভাসমান শুভ্র শাপলার হাসি সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন এক নতুন রুপ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে !
রায়হান সাহেব এর ডাকাডাকিতে রানু উঠে এলো! চোখ কচলে বাবার দিকে তাকাতেই দেখলো বীথি এই সাত সকালে চা এর মগ হাতে বাবার চুল টেনে দিচ্ছে। রায়হান সাহেব পরম সুখে চোখ বুঝে আছেন।
রানুকে দেখেই বীথি বললো,
– ঝটপট মুখ ধুয়ে আয় । আমরা তিনজনে মিলে হাটতে যাবো। বলেই আবার বাবার চুল টানায় ব্যাস্ত হয়ে পরলো।
রানু ঘুম চোখে মাথা ঝাকিয়ে আবার ভিতরে চলে গেলো।
পূব আকাশে সুর্য্য তখনো উঁকি দেইনি । অন্দ্বকার কেটে যাওয়ায় চারিদিকে একটা শান্ত আলোকিত ভাব। আহ ! কি চমৎকার সকাল!
বাড়ী থেকে নদী বেশীদুর নয়। ১০০ গজ হবে। হাটতে হাটতে ওরা তিনজনই নদীর পার চলে এলো। স্বচ্ছ টলমলে জলে নদী কানায় কানায় পুর্ন। হালকা শীতল বাতাস বইছে।
সবে এখন পুর্ব দিগন্তে হলুদ লাল সংমিশ্রনে সূর্য্যি উদয়ান্ত হচ্ছে।
জীবনের যান্ত্রীকতা থেকে কিছুটা দুর, প্রকৃতির এই প্রসন্নতায় মানুষের মন কখনো কখনো উদাসী হয়ে উঠে! রায়হান সাহেবের মুখে উদাসীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠলো।

*****************
বীথি আর রানু “জমির মিয়ার কেরামতি চা” এর টংগে বসে আছে অধীর আগ্রহে। চোখে মুখে ভয়াবহ উত্তেজনা। জমির মিয়ার ৮ বছরের নাতি মজনু বিলাতি শিশ দিয়ে দিয়ে টুংটাং শব্দে মনের আনন্দে চা বানাচ্ছেন। মজনুর নামের শেষে বিলাতি লেজ লাগানোর একটা বিশেষ কারন আছে! মজনুর জন্মের সময় তার বাবা মালেয়সিয়ায় থাকতেন। সন্তানকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি । কিন্তু সন্তানের নামের শেষে বিলেতি লেজ জুড়ে দিতে পেরে মহা আনন্দিত হয়েছিলেন। তবে সেই লেজ বিশিষ্ট ছেলেকে তিনি দেখে যেতে পাবেননি। মজনুর জন্মের ৬ মাস পরই তিনি রোড এক্সিডেন্ট এ মারা যান। সেই থেকেই মজনু বিলাতি তার নানার কাছে আছে।
জমির মিয়া তার বিকট দাঁত বের করে আছেন । রুপবতী দুইটা মেয়ে তার ধুলি পরা নড়বড়ে টুলে বসে ময়লা কাপে চা খাবে। এই বিস্ময়ে জমির মিয়ার মুখ বন্দ্ব হচ্ছেনা!
মজনু বিলাতি চা বানানো শেষ।
– আপা চা রেডি ! ফোঁকলা দাঁত বের করে মজনু চা এর কাপ বাড়িয়ে দিল।
চা হাতে নিয়ে কাপে চুমুক দিয়েই বীথির চোখ গোল হয়ে গেলো।
-কি রে মজনু ! এত মজার চা বানানো তোকে কে শিখিয়েছে? বললো বীথি ।
– সবই আল্লাহর ইচ্ছা আপা! এবার মজনুর বাকি দাঁত গুলোও চকচক করে উঠলো!
-হুম! বললো বীথি!
-তুই পরাশুনা করিস না ? বীথির প্রশ্ন।
– না আপা ।
-কেন? নানাকে সাহায্য করেও তো তুই স্কুলে যেতে পারিস।
– সবি আল্লাহর ইচ্ছা আপা! কপালে নাই পড়ালেখা। চা বেঁইচা পেটই চলেনা। পড়াশুনা করমু কেমনে !
এবার মজনুর চোখে অসহায়ত্ব ফুটে উঠলো।
– তুই স্কুলে ভর্তি হবি কাল। আমি তোর পড়াশোনা করাবো! বলেই বাথি উঠে দাড়ালো!
– আপনি কেন আমারে পড়ালেখা করাইবেন আপা ? মজনুর মুখ হা হয়ে আছে! বিস্ময় কাটছে না!
– সবি আল্লাহর ইচ্ছা রে মজনু ! বলেই বীথি টংয়ের বাহিরে পা বাড়ালো।
ততক্ষনে রায়হান সাহেব ও রানুও চা শেষ করে উঠে দাড়িয়েছেন। তিন জনেই বাড়ী পথে পা বাড়ালেন।
যেতে যেতে বীথি ভাবলো, গরীব হয়ে জন্মানো আল্লাহর ইচ্ছা! জন্মে জীবনভর গরাব থাকাও কি আল্ল্হর ইচ্ছা?
মজনু স্কুলে যাবে! একদিন মস্ত বড় অফিসার হবে। কোট টাই পরে অফিস যাবে। বউ হবে! বাচ্ছা হবে। কোন এক শীতের রাতে বউ বাচ্ছা নিয়ে মুভি থিয়েটারে বসে পপকর্ন চিবুবে। আলো আঁধারীর বন্দ্ব কামরায় দুষ্টুমির ছলে বউ এর কাঁদে মজনুর আংগুল ছুঁয়ে যাবে!
সময়ের সাথে বদলে যায় দিন! বদলে যাবে মজনু বিলাতির জীবনও !

******************
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। স্বচ্ছ নীলাকাশে সাদা তুলার মত মেঘেদের সাথে সূর্য্যিমামার লুকোচুরি খেলা চলছে। মৃদু শীতল হাওয়ায় প্রান জুড়িয়ে যায়। আকাশের সঙ্গে মেঘের লুকোচুরি দেখে রায়হান সাহেবের মনে পড়ে যায় শৈশব ,কৈশোর ও যৌবনে কাটানো এমনি কত স্মৃতির কথা! মেঘবালিকাদের সাথে মিতালী করে উড়ে যাওয়া সাদা বকেদের মত উড়ে যেতে মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে আজ রায়হান সাহেবের! যত অস্থিরতা আজ তার মনের আকাশে তা কেবল প্রীতিলতার জন্যই । ক্ষনে ক্ষনে মনের আকাশ বেদনায় ঢেকে যায় এক অনিশ্চয়তায়! ভাদ্র মাসের আকাশের মতই গুম হয়ে থাকে রায়হান সাহেবের মনের কষ্ট, তবু কান্না হয়ে কাউকে ভিজিয়ে দেয়না!
এমনি নানান ভাবনায় যখন রায়হান সাহেব বিচলিত, তখনি ঘারের কাছে কারো উপস্থিতি টের পেলেন। বিমর্ষ রায়হান সাহেব ঘোর কাটিয়ে ফিরে তাকাতেই চমকে উঠলেন! কিছু বুঝার আগেই প্রীতিলতা বাবার কোলে ঢলে পরলো !

***********************************************************************************************
রানুর ইতিকথা ! ( পর্ব ৫ )

******************
গতকাল থেকে প্রীতির শরীর খুব খারাপ যাচ্ছে। চোখ মুখ শুকিয়ে গর্তে ঢুকে গেছে। মেয়েটা কিছুই মুখে দিচ্ছেনা। বেশ কয়েকবার বমিও হয়ে গেলো। ডাক্তার কাকা এসেছিলেন কাল রাতে। হার্টবিট, ব্লাড প্রেসার আর পালসরেইট দেখে রায়হান সাহেবকে বলে গেলেন সময় করে আজ বিকেল নাগাদ একবার যেন তার চেম্বারে আসেন।
দেখতে দেখতে প্রায় আড়াই মাস হয়ে গেলো। বীথিদের যাওয়ার সময় ও চলে এলো। মেয়ের চলে যাওয়ার কথা মনে এলেই মন ভীষন ভার হয়ে যায় রাহেলা খাতুনের। এটাই নিয়ম। মেয়ের সংসার ফেলে তো আর সারাজীবন এখানে ধরে রাখা যায়না ! তাছাড়া বাচ্ছাদের ও স্কুল আছে! সুরেলা প্রি-কে আর ছোটন কিন্টারগার্ডেন এ পরে। এমনিতেই ওদের পড়াশোনা ও স্কুলের ক্ষতি হচ্ছে ।
রাহেলা খাতুন মেয়ের জন্য কিছু নকশী কাঁথা করেছেন। প্রীতি নিজ হাতে করেছে একটা বোন কে দিবে বলে। রান্নার সব ধরনের মশলার ফাকি প্যাকেট করে রেখেছেন তিনি। কয়েক ধরনের শুটকি ও প্যাকেট করেছেন মেয়ে জামাইয়ের জন্য।ওখানে সব কিছুর এত দাম ! বীথি বলেছে খাটি সরিষার তেল দিতে ২ বোতল। রায়হান সাহেব মেয়ের জন্য সরিষা ভাঙিয়ে তেল করে রেখেছেন।
আজকের সকালটা খুব ফুরফুরা। সকাল থেকেই ঝকঝকা রোদ দেখা যাচ্ছে। আকাশ পরিস্কার । নীলে আর সাদায় মিলে ভীষন রকমের এক সচ্ছতা। রাহেলা বেগম খুব যত্ন করে আজ সকালের নাস্তা বানিয়েছেন । ঘি ভাঁজা পরোটা । সাথে মিশ্র সবজি ভাজি আর পায়েস। ছোটন আর সুরেলাও ততদিনে বাঙ্গালী নাস্তা খাওয়া শিখে গেছে।
সবাই খেতে বসেছে এক টেবিলে। রাহেলা খাতুন খুব যত্ন করে সবার পাতে বেরে দিচ্ছেন।
মায়ের হাতের পায়েস এর তুলনাই হয়না ! বীথি পায়েস মুখে দিতে দিতে বললো,
– মা, তুমি যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাধুনী, এটা কি জানো?
রাহেলা বেগমের চোখে পানী চলে এলো। চোখের পানী আড়াল করতে তিনি রান্নাঘরে চলে গেলেন । কিছু কিছু চোখের পানী সবাইকে দেখাতে নেই।

*****************
সেই কখন থেকে রায়হান সাহেব আর রানু বসে আছে ডাক্তার বাবুর চেম্বারে। এক ঘন্টা হলো প্রায়। প্রীতি নখ খুটে খুটে দুর্বল চোখে এদিক ওদিক দেখছে।
রায়হান সাহেব এর হাতে দুটি পানির বোতল। একটি বোতল তিনি প্রীতির দিকে এগিয়ে দিলেন।
– পানি খাবি রে মা ?
প্রীতি মাথা নেড়ে না জানালো।
– তুই খাবি রানু?
রানু হাত বাড়িয়ে পানির বোতলটি নিলো। ঢগঢগ করে প্রায় আধা বোতল শেষ করে ফেললো।
রানুর অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। কিসের অস্থিরতা ঠিক বুজতে পারছে না। মনে হচ্ছে শৈত্য প্রবাহে কোথাও কিছু একটা জমে যাচ্ছে। আবার প্রচন্ড তাপে সেই জমে যাওয়া কিছু গলে গলে পরছে।
পর্দা সরিয়ে ডাক্তার বাবুর এসিস্ট্যান্ট রায়হান সাহেবের দিকে হাত নেড়ে ভিতরে যেতে বললেন । রায়হান সাহেব ভয়ার্ভিত মুখে ভিতরে ঢুকলেন। পিছু পিছু রানু। রানুর অস্থিরতা আরেক ধাপ বেড়ে গেলো! কুকুরের মত নাকের ডগায় একটা দুর্গন্দ্ব টের পেলো! ডাক্তার বাবু নির্বোধ মুখে খুব সরল ভাবে বললেন,
– যা ভেবেছিলাম ,তাই !
– কি ভেবেছিলেন ? রায়হান সাহেব উদ্বিগ্ন ।
রানুর কান খারা হয়ে গেলো। বুক ধুকধুক করছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি প্রচন্ড তাপে কিছু একটা গলতে শুরু করেছে !

****************
সময়ের সাথে সাথে বদলে যায় জীবন, বদলে যায় জীবনের রথ। সেই সাথে খুব সুকৌশলে বদলে যায় সারথী, বদলে যায় আরোহী। শুধু বদলায় না মস্তিস্কের কোন এক গোপন কুঠুরীরে ঘাপ্টি মেরে থাকা বহু পুরাতন স্মৃতি। হাজার চেস্টায় ও সে স্মৃতিকে অস্বীকার করা যায়না। সরানো যায়না। তেমনি একটা স্মৃতি আজ বার বার রানুর মনকে অস্থির করে তুলছে।
তখন রানু ক্লাস সেভেন এ পড়ে। গ্রাম থেকে ছোট মামা এসেছেন তার দলবল নিয়ে শহরে ডাক্তার দেখাবেন বলে। সব মিলিয়ে উনারা ৭ জন । রাতে এক রুমে গাদাগাদি করে সবাই কে ঘুমানোর ব্যাবস্থা করেছেন রাহেলা খাতুন। শীতের রাত। পর্যাপ্ত লেপ বা কম্বল না থাকায় সবায় ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন । রানু সবার ছোট বলে, তার কম্বলটিও দিয়ে দেওয়া হলো ছোট মামার পরিবারকে। সেই রাতের জন্য রানুকে বলা হলো প্রীতির সাথে কম্বল ভাগ করে ঘুমাতে। যথাবীতি রানু গেলো প্রীতির সাথে একি কম্বল ভাগ করে ঘুমুতে। সেই রাতে একটু বেশীই যেন শীত বেড়ে গেলো। হঠাত প্রীতি লক্ষ্য করলো রানু ঠকঠক করে কাঁপছে। কপালে হাত রেখে প্রীতি ভীষন চমকে গেলো। একি ! গা তো পুরে যাচ্ছে রানুর ! এত রাতে মাকে আর না ডেকে, নিজেই কাপর ভিজিয়ে বাটিতে করে নিয়ে এলো। গায়ের কম্বলটি দুভাজ করে রানুর গায়ে পেঁচিয়ে দিয়ে, রাতভর ছোট বোনের কপালে ভেজা কাপর দিয়ে মুছে দিতে লাগলো। রানু শুধু শক্ত হাতে প্রীতিকে জড়িয়ে রেখেছিল।
কতকথা আজ স্মৃতির ক্যানভাসে যে ভেসে উঠছে রানুর ! চোখের কোনে মুক্তদানা গুলো ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়ছে দুগাল বেয়ে। কেন এমন হয়? মানষের জীবন আসলেই নদীর মতো। নদীর বাঁক পরিবর্তনের মতোই মানুষের জীবন বারবার নতুন দিকে মোড় নেয়।
নানা ঘটন-অঘটনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে মানুষের জীবন।জীবনের অনেক কিছুই হঠাৎ বদলে যায় কোন আগাম সংকেত ছাড়াই। কেন বদলে যায়? জানতে চেয়েও জানা হয়নি জীবনের এই কঠিন রহস্য।
চোখের পানীগুলো মুছে নিয়ে রানু এগিয়ে গেলো প্রীতির ঘরের দিকে। প্রীতি শুয়ে আছে এক কাত হয়ে। ভীষন দুর্বল আর বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে প্রীতিকে।
– আপু।
ঘুরে মুখ ফিরালো প্রীতি।
– তোর সাথে কিছু কথা আছে। বলেই ঘরের দরজাটি হুট করে বন্দ্ব করে দিলো রানু।

*******************************************************************************************
রানুর ইতিকথা ! ( শেষ পর্ব )
*********************
সব স্পর্শই কি মমতার নদীতে ভালবাসার ঢেউ তুলে? স্নেহের বাঁধনে সম্পর্ককে পোক্ত করে ? নাহ ! করেনা। কিছু স্পর্শ কেবল কামনায় সিক্ত হয় ! চিরসত্য যা তা অস্বীকার করা সহজ নয়। অহংকারী বীর্যবান পুরুষের পশুত্ব ঘাপ্টি মেরে থাকে দিনের আলোয়। সুযোগ পেলেই নিশিথে মাথা চারা দিয়ে উঠে ভিতরের লুকায়িত পশু। হুংকার ছেড়ে মনুষ্যত্ব হারায় বীর্পুযবান পুরুষ! ঢেকে দেয় এক সীমাহীন আঁধারে নারীর নারীত্ব !
দুর্বার কান্নায় পাথরের চোখে জল এসে যায়, তবু সে জল স্পর্শ করেনা পুরুষের কঠিন হৃদয়। পুরুষ চিরকালই পিপাসার দাস। সেই পিপাসায় ভুভুক্ষ পুরুষ ছিন্ন করেছে কত বন্দ্বন। চটি পায়ে মাড়িয়ে গেছে কত সদ্য ফুটে উঠা লাল- নীল -হলদে সন্দ্ব্যা মালতীর বাগান ! তার দুর্গন্দ্বময় বীর্য ছড়িয়ে দিয়েছেঞ্জমিনে জমিনে, কাল থেকে মহাকালে। পুতে দিয়েছে নারীর সতীত্বকে হাজার গজ জমিনের গহীনে যেখানে উর্ভর মাটি শেষে কেবল উনুর্ভর কীট-পতঙ্গ মাটি আঁকরে বেড়ে উঠে। রানুর ভাব্লেশহীন মুখে কোন ক্রীয়া- প্রতিক্রীয়া নেই আজ। যেন তার অন্তরাত্বা জানে ভবিষ্যৎ ! শীতল চোখে রানুর এক ঝলক আনন্দের হাসি খেলে যায় হঠাত।
রায়হান সাহেব কে ঘুমের ঔষদ দেয়া হয়েছে। প্রেসার অত্যন্ত নেড়ে গিয়েছিল। রাহেলা বেগম স্বামীর পাশেই বসে আছেন। মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। বীথি তার জিনিস পত্র গোছাতে ব্যাস্ত। আর মাত্র ৩ দিন। বীথি ফিরে যাচ্ছে।
– আসবো আপু? দরজায় দাঁড়িয়ে রানু জিজ্ঞেস করলো।
– আয়। বীথি কাপর গুছাতে গুছাতেই বললো।
– আপু।
– হুম।
– তুকে আমি খুব বেশী রকমের ভালবাসি। রানু বললো।
– জানি রে পাগলী। আমিই তোকে খুব ভালবাসিরে রানু। বলেই বীথি ঘুরে দাড়ালো। দু’হাতে রানুকে জড়িয়ে ধরলো। বীথির চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে। রানু দু’হাতে বোনের পিঠ আকড়ে ধরে বললো,
– পৃথিবীর নিয়ম খুব বিচিত্র। তুই কি জানিস আপু, ভালবাসার মানুষ গুলোকেই আমরা সবচেয়ে বেশী কষ্ট দেই?
রানুর ভিতরের শক্ত জমে যাওয়া কিছু একটা যেন আবারো গলতে শুরু করেছে। অলক্ষে চোখের জল গড়িয়ে পরছে। দু’বোনের ফোঁটা ফোঁটা চোখের জলে গড়ে উঠছে এক জল ভরা দীঘি। কেউ জানেনা কার ব্যাথা কিসে ! একি দীঘিতে কষ্টের নোনাজলে টই টুম্বুর। শুধু সেই জলের স্বাদ ভিন্ন।
রানু এবার শক্ত করে বোনকে চেপে ধরলো।

****************
দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয় নাশক দুর্গা যেন আজ শশরীরে নেমে এলো ধরনীর বুকে। দুর্গম নামক অসুরকে বধ করতে মা দুর্গার হাত কাপেনি। মহিষাসুর কে পরাস্ত করে করে পাপমুক্ত হতেও তার হৃদয় কাপেনি। কতভাবেই না মহিষাসুর নিজের প্রান বাচাতে দুর্গার শক্তিকে ব্যাহত করতে চেয়েছেন। কখনো মহিষের বেশে, কখনো সিংহ বা হাতীর বেশে। কিন্তু প্রতিবারই দুর্গা তার প্রতিবাদী তলোয়ারের ঝংকারে হয় গলা থেকে মাথা কেটে আলাদা করে দিয়েছেন। নয় সূড় কেটে পরাশক্তির শক্তিকে বধ করেছেন।শুভ শক্তির কাছে অশুভ শক্তির পরাজয় নিশ্চিত !

ভোরের কাক তখনো ডাকতে শুরু করেনি। চারিদিকে আলো আধারীর এক অস্পষ্ট খেলা। প্রকৃতি আজ ভীষন শান্ত। মাঝে মাঝে কিছু শুকনো পাতার মরমর ধ্বনি। আর নিন্মসুরে চাপা এক করুন সানাইয়ের ধ্বনি বেজে চলেছে। বাড়ীময় এক নিষ্ঠুর নীরবতা।
রায়হান সাহেব হত বিহব্বল । তার দৃস্টিতে কোন ভাবের লেশ নেই।পৃথিবীর নিষ্ঠুরতায় তিনি বাকরুদ্ব। রাহেলা বেগম জ্ঞ্যান হারিয়ে পরে আছেন বিছানায়। প্রীতিলতা গভীর মমতায় মায়ের মুখে চোখে পানির ছিটা দিচ্ছেন। এই মুহুর্তে মা কে সারিয়ে তুলাই যেন মুখ্য। বীথি দুই ছেলে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ডুকরে ডুকরে কেঁদে যাচ্ছে। বিস্ময়ে বাচ্ছারা একে অন্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। কিছুই বুঝতে পারছেনা।
শুধু রানুকেই খুব শান্ত দেখাচ্ছে। তার নিষ্ঠুর জলজলে চোখে এক তৃপ্তির আভাস। ঠোটের কোনে ঈষৎ হাসি। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রক্তে ভেজা বটিটা এবার মাটিতে ছুড়ে ফেললো রানু। পাশেই রক্তে ভেসে যাচ্ছেন মঞ্জুরুল হক।
পাপকে একদিন বাঁচিয়ে রাখা মানে পৃথিবীর একদিনের ক্ষয়। পাপকে চিরতরে তৎক্ষণাৎ নির্মুল করে দিতে হয় ! তবেই না ধরনী শান্ত হয় !
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নির্যাতিত, নিপীড়িত ও অত্যাচারিত জীবের দুর্গতি হরণ করার জন্য আবির্ভাব হইয়েছিল দেবী দুর্গার, তেমনি যেন স্রষ্টা নতুন রুপে দুর্গার পুন-আবির্ভাব ঘটালেন রানুকে দিয়ে! রানুর আরেক নাম হয়ে গেলো দুর্গা।

সমাপ্ত !