অসমাপ্ত ভ্রমন

***
কু ঝিক ঝিক কু ঝিক ঝিক…… ঢাকা টু চিটাগং,রাতের ট্রেনটা ছুটে চলেছে প্রবল গতিতে। বিনুর পাশেই হেলান দিয়ে আধো ঘুমে ঝিমুচ্ছেন রাহেলা খাতুন। বিনু বসেছে ঠিক জানালার পাশে। মুখোমুখি এক মাঝ বয়সী ভদ্রলোক এর সাথে সীট ভাগাভাগি করে বসেছে তনু ।বিনু আর তনু, মা এর সাথে চিটাগং যাচ্ছে বড় বোনের বাড়িতে। শালুদির প্রথম মেয়ে দেখতে যাচ্ছে। বিনু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ ইংলিশ অনার্স এর ছাত্রী। তনু নবম শ্রেণির ছাত্রী।
 
রাহেলা খাতুন এর তিন মেয়ে। কোন ছেলে সন্তান হয়নি। রাহেলা খাতুন এর স্বামী গত হয়েছেন আজ প্রায় ৭ বছর। তখন থেকেই রাহেলা খাতুন একা মেয়ে গুলোকে নিয়ে আছেন। শালুকে বিয়ে দিয়েছেন ৩ বছর আগে। স্বামীর রেখে যাওয়া ৩ তলা বাড়ীটির একতলা, দিতীয় তলা ভাড়া দিয়েছেন। স্বামীর তরফ থেকে পেনশন এর কিছু টাকা আসে প্রতি মাসে। আর বাজারে কিছু দোকান ভাড়া। ব্যাস! চলে যায় রাহেলার সংসার ভাল মতেই।
রাহেলা খাতুন এর ঘুম মনে হচ্ছে এবার ভালোয় জমেছে। মুখটি হা হয়ে আছে। তনু জানালা দিয়ে বাইরে দেখছিল। সেই কমলাপুর থেকে ট্রেনে উঠার পর থেকেই বিনুর দৃষ্টি জানালার বাইরে। মা’কে হা করে থাকতে দেখে বিনুর চোখে মুখে এবার বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
 
– মা উঠে বসো।
বিরক্তিতে রাহেলা খাতুন এর গা ধাক্কা দিল বিনু। রাহেলা খাতুম একটু নড়েচড়ে বসেই আবার মুখ হা করে নাক ডাকতে লাগলেন।
-আপু। তনু ডাকলো।
-হুম। বিনুর বিরক্তিসুরে উত্তর।
-ক্ষুদা লাগসে।
– মা’কে ডাক।
বলেই বিনু জ্বানালার বাইরে তাকালো।
 
তনুর পাশে বসা লোকটি খুব মজা করে শব্দ তুলে বাদাম খাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন যাবর কাটছে। বাদামের খোসাগুলো ট্রেনের ফ্লোর এ ফেলছে। তনু আড় চোখে লোকটিকে দেখলো। কিছু বলতে গিয়েও যেন থেমে গেল। হঠাৎ ট্রেনটা এক ঝটকায় কোথাও থেমে পড়লো। সবাই নড়ে উঠলো। রাহেলা খাতুন এর ততক্ষনে একচোট ঘুম হয়ে গেছে। চোখ খুলতেই তনু ডাকলো….
 
-মা।
– কিরে! রাহেলা খাতুন এর ঘুম জড়ানো কন্ঠ।
-খাব। ক্ষিদা লাগসে।
-সে কি রে! ডাকিসনি কেন?
– আপুকে বলেছিলাম তো। ডাকতে দেয়নি।
রাহেলা খাতুন এবার ভ্রু কুচকে তাকালেন বিনুর দিকে। নিজের মনে বিড়বিড় করে কি সব বলতে বলতে, খাবারের পটটা হাতে তুলে নিলেন। আসার সময় রাহেলা খাতুন অনেক খাবার করে এনেছেন। পাটী শাপ্টা পিঠা, ডাল পুরি, চিকেন কাবাব, তেলের পিঠা, চানাচুর, আর ফ্লাক্স ভর্তি চা। দুটো কাবাব আর পিঠার বাটিটা তনুর দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
-চা খাবি তনু?
– খাব। একটু দাও।
রাহেলা বেগম ফ্লাক্স থেকে কাপে করে চা ঢেলে দিলেন।
 
***
রাতের প্রকৃতির দিকে চোখ বুলাতে বুলাতে কখন যে বিনুরও চোখ বুজে এসেছিল টেরও পায়নি। যখন চোখ খুললো, সকাল হয়ে গেছে। বাড়বকুন্ড স্টেশন ৫৩ লিখা বড় সাইন বোর্ডটা চোখে পড়লো। হুরমুর করে লোকজন নামছে, উঠছে। অল্পদূর চোখ যেতেই সিগ্ন্যাল গার্ড এর চোট্ট কুটুরীটা চোখে পড়লো বিনুর। এখন এটা টি-স্টল। এক কাপ ফ্রেশ চা হলে মন্দ হয়না। মা এর ফ্লাক্স ভর্তি করে আনা চা খেতে ইচ্ছে করছে না। বাসী চা খেতে কেমন ভাতের মারের মত লাগে।
বিনু হাত ব্যাগটা হাতে নিয়ে উঠে দাড়ালো।
-তনু চল চা খেয়ে আসি।
বলে তনুকে ঈশারায় ডাকলো বিনু।
তনুর চোখে মুখে উত্তেজনা দেখা দিল। আগে কখনো সে এমন টি-স্টলে চা খায়নি।
– চলো।
বলে তনু লাফিয়ে উঠল। রাহেলা খাতুন ও আগ্রহে উঠে দাঁড়ালেন।
– বিনু! আমিও চা খাব চল। বললেন রাহেলা খাতুন।
বিনু ভ্রু কুচকে তাকালো মা এর দিকে। বললো,
– তুমি যাবে কেন মা?
– কেন যাবনা? আমিও তোদের সাথে চা খাই চল।
– নাহ! তুমি থাক। ফ্লাক্স ভর্তি চা আছে, খাও আর পেপার পড়।
– কেন? গেলে কি হয়?
রাহেলা খাতুন অসহায় মুখ করে বললেন।
– তুমি গেলে আমাদের আনন্দে পানি পড়বে। বরং তুমি খাবার আর ব্যাগ গুলো পাহাড়া দাও মা।
রাহেলা খাতুনকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বিনু নেমে গেল তনুকে নিয়ে।
 
রাহেলা খাতুন অবাক বিস্ময়ে মেয়েদের চলে যাওয়া দেখলেন। দিন দিন মেয়েটা এত বেয়াদপ হয়ে যাচ্ছে কেন! এ মেয়ে তো স্বেচ্ছাচারী! তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন মেয়ের ভবিষ্যৎ কালো কুচকুচা অনেকটা মোজাম্মিবিকের চোপিকদের মত। এই মেয়ে মহা বিপদে পড়বে একদিন!
বিশাল আয়তনের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অগত্যা রাহেলা খাতুন চা এর ফ্লাক্সটা হাতে নিলেন।
 
***
টি-স্টল এর কাছে এসে দুই বোন এদিক-ওদিক দেখছে। আহ! কতদিন ময়লা কাপে পানি টলটলা চা খায়নি বিনু। দুই কাপ চা বানাতে বলে ওরা বসলো পুরানো চারপায়া নড়বড়ে টুলটা তে।
 
– আফা, কয় চামচ চিনি দিমু? স্টল বয় লাল কোদালের মত দাঁত বের করে জিজ্ঞেস করলো।
– ১ চামচ। বিনু বললো।
– জ্বে আইচ্ছা আফা।
স্টল বয় বানাতে ব্যস্ত হয়ে পরলো। টুং টাং শব্দে চামচ নেড়েচেড়ে দুই কাপ চা এগিয়ে দিল ওদের দিকে। বিনু কাপের হাতলের দিকটা মুখের দিকে ঘুরিয়ে চায়ে চুমুক দিল। আহ! চা টা বেশ! অন্তত ফ্লাক্স এ রাখা ভাতের মারের থেকে ভাল।
– কিরে, নাম কি তোর? বিনু জিজ্ঞেস করলো।
– মিলন আফা। জবাব দিয়ে মিলন চা বানাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল।
– স্কুলে যাস না?
– নাহ আফা!
– কেন? বিনুর কৌতুহলি দৃষ্টি মিলনের দিকে।
– বাপ এর অসুখ। বিছানায় পড়া। মা এক সাবের বাড়িতে কাজ করে। বাপ এর অশুদ কিনতে হয়। টেকা কই পামু আফা! তাই স্কুলে যাইনা। ইস্টিশনের এক সার আমারে এইনে চা বেচতে কাম দিসে।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল মিলন। বিনু এতক্ষন দেখছিল মিলন এর টুং টাং শব্দে চা বানানো। তনু চা এ চুমুক দিচ্ছে আর মজার মজার শব্দ করছে। বিনু চা শেষ করে উঠে দাঁড়ালো।
– এই নে। বাবার ঔষদ কিনিস।
বলেই দুইটা ১০০০ টাকার নোট বের করে মিলনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হনহন করে ট্রেনের দিকে পা বাড়ালো বিনু। মিলন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো।
তনু পিছু পিছু দৌড়ে এলো।
– আপু। এতগূলো টাকা দিয়ে দিলে?
তনুর চোখে মুখে বিস্ময়। বিনু কোনো জবাব দিলনা। ট্রেনে উঠে এলো।
 
কিছু কিছু প্রশ্নের কোন উত্তরও হয়না।
 
***
বাড়বকুন্ড স্টেশন থেকে ট্রেনটি সামনের দিকে এগুচ্ছে! বিনুর পাশের সিটের ভদ্রলোক ততক্ষনে নেমে পড়েছেন। তার জায়গায় এখন বসে আছে ব্ল্যাক প্যান্ট আর ব্লু শার্ট পরা এক ভদ্রলোক। বয়স ২৬/২৭ আনুমানিক। এই বয়সের লোকদের না বলা যায় তরুন, না বলা যায় যুবক। চোখে কালো মোটা ফ্রেম এর চশমা। মুখের সামনে সেই কখন থেকে সমরেশ বাবুর কাছের মানুষ বইটা ধরে আছে।
একটু দূরেই একদল ছেলে চাদর বিছিয়ে ফ্লোর এ গোল হয়ে বসে তাস খেলছে। মাঝে মাঝে ভয়ংকর সব বাক্য চর্চা করছে উল্লাসে। বিরক্তিকর পরিবেশ।
 
মায়ের যাবর কাটায় এলারজি আছে বলে মনে হয় বিনুর। এত শব্দ করে খায়! তার সব কিছুতেই শব্দ। ঘুমুলেও নাক ডাকেন শব্দ করে। । বাবা যে উনাকে কি করে এতটা বছর সহ্য করেছেন! চোখে-মুখে বিরক্তি নিয়ে বিনু বসে রইল।
 
বিনুর পাশে বসা লোকটি এবার বই থেকে চোখ নামালেন। এক দৃষ্টিতে বিনুর দিকে চেয়ে আছেন। বিনুর চোখ পরতেই আবার বইটা মুখের সামনে মেলে ধরলেন। বিনু উঠে দাঁড়লো, টয়লেট এ যাবে। বগির দরোজার কাছটায় যেতেই পাশের লোকগুলোর কারো একজনের গা থেকে ঘামের গন্ধ লাগলো নাকে। আঁশটে ধরনের গন্ধ। নাক চেপে যেই বিনু টয়লেটে ঢুকতে যাবে, অমনি লোকগুলি খিক খিক করে হেসে উঠল।
আচ্ছা, ছেলেদের ঘামের গন্ধ কি মেয়েদের থেকে আলাদা হয়? কখনো সেভাবে ভেবে দেখা হয়নি। তবে মেয়েদের ঘামের গন্ধে মাতাল করা একটা পাগলা সুবাস থাকে, এটা সব পুরুষকেই মানতেই হবে।
 
টয়লেট সেরে বিনু ফিরে এলো নিজের সিটে। লোকগুলি তখনো অকারণে হাসল।এই হাসির কারণ কি হতে পারে? টয়লেটে একটি মেয়ে কি করতে পারে তা ভেবে কি ওদের এমন অকারণ হাসির উদ্রেক?
পাশে বসা লোকটা আবারো আড় চোখে তাকাচ্ছে বিনুর দিকে। মুখে মিষ্টি বিনয়ের হাসি। অদ্ভুত ধরণের মানুষগুলিই পারে এমন মিষ্টি করে হাসতে। বিনু ঘার ঘুরিয়ে জানালার বাইরে চোখ ফিরালো।
 
মোবাইলে টেক্সট এসেছে। টেক্সটা এক নজর দেখে আবার জানালার বাইরে মুখ ফেরালো বিনু। রাতুলের টেক্সট। জানতে চেয়েছে ওরা কতদূর এলো। পথে কোনো সমস্যা হল কিনা । জবাব দিতে ইচ্ছে করছেনা বিনুর।
রাতুল এর সাথে বিনুর আজ প্রায় ১ বছর হল বিয়ের। রাহেলা খাতুনের পছন্দের পাত্র। বিনু না করেনি। এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল। লোকটা মন্দ না।
 
রাহেলা খাতুন ইতিমধ্যে বিনুর পাশের সিটের লোকটির সাথে খাতির জমিয়ে ফেলেছেন। পাটি শাপ্টা পিঠা খাওয়াচ্ছেন যত্ন করে ভদ্রলোকে। মাইয়ের এই অভ্যাসটা বহুদিনের। সবাইকে খুব নিজের করে ফেলেন সহজেই।
 
***
ট্রেন ছুটছে ধীর গতিতে। বাহিরটা কেমন সবুজে ছেয়ে আছে। আশে পাশের পুকুরগুলোতে অদ্ভুত রকমের সবুজ পানি। কিছু ছেলে মেয়ে সবুজ পানিতে হাঁসের পিছু ছুটছে। ছেলে বেলাটা সত্যিই বড় আনন্দের। আরো একটা জিনিস খুব অবাক করলোবিনুকে। রেল লাইনের ধারে সারি বেঁধে গড়ে উঠেছে ছোট্ট ছোট্ট বস্তি । নোংরা ঘরের বাহির স্পষ্ট দেখে যায় ট্রেন থেকে। ছোট ছোট বাচ্চারা খালি গায়ে দৌড়ছে। কারো কারো হাতে গোল সাইকেলের রিং। ওদের সাথে একটা রাত কাটালে মন্দ হতনা। শহুরে মেয়ের কাদাবালি নর্দমায় জীবন যাপন- অনেকটা থ্রিলিং গল্পগুলোর মত।
 
ট্রেনটা এসে কৈবল্যধাম (স্টেশন নং- ৫৭) স্টেশন এ পৌছলো। যাত্রীরা অনেকেই নেমে পড়তে লাগলো। বিনুর পাশে বসা লোকটিও ততক্ষনে নেমে গেছে। তনু চোখ বাড়িয়ে এদিক ওদিক দেখলো। হঠাৎ চোখ পড়লো উঠে যাওয়া লোকটির সিটে।। সমরেশ বাবুকে একা ফেলেই লোকটি উঠে গেছে।
তনু মাথা নেড়ে নেড়ে ঝালমুড়ি খাচ্ছিল। বিনু ইশারায় ডাকলো-
– ঝালমুড়ি খাবে আপু ? তনু জিজ্ঞেস করলো।
– নাহ। বইটা দে তো তনু।
তনু বইটা বিনুর কোলে ছুড়ে দিয়েই আবার ঝালমুড়ি খাওয়ায় ব্যাস্ত হয়ে গেল।
বিনু বইটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলো। হঠাৎ বইটার ভিতর থেকে এক টুকরা কাগজ মেঝেতে পড়লো। কাগজটা হাতে নিল বিনু। পড়তে গিয়েই থমকে গেল। সারা চোখে মুখে অবাক করা এক বিস্ময় ছেয়ে গেল।
বইটির ভিতরে এক টুকরো কাগজ টেপ দিতে লাগানো। তাতে লোকটি গোটা গোটা অক্ষরে লিখেছে …
 
” নাম না জানা রাজকুমারী,
কেন জানি মনে হল, আমি স্টেশনে নেমে যাওয়ার পরই তুমি আমায় খুঁজবে । নাম্বারটা দিয়ে গেলাম। ”
বিনুর বিস্ময় এখনো কাটছেনা। লোকটা কি করে জানলো সে তাকে খুঁজবে! আশ্চর্য!
মোবাইল ফোনটা বাজছে। রাতুল এর ফোন। বিনুর সেদিকে কোন খেয়াল নেই। ফোনটা ধরতে ইচ্ছে করছেনা। বার বার মোবাইল নাম্বারটা মাথায় ঘুরছে। ০১৯১২…
 
মানুষের মন বড় বিচিত্র। মানুষ ভাবে এক হয় আরেক। জীব বৈচিত্রের মতো মানব বৈচিত্র নিয়ে যদি কোনো এডুকেশন থাকত, তাহলে হয়তো মনকে বুঝার ও জানার কিছু সুত্র থাকত । মাঝে মাঝে মনে হয় দুনিয়ার সবচেয়ে আজব জিনিস মানুষের মন। মানুষ কি কখনো তার মনকে পুরোপুরি বুঝতে পেরেছে? মন নিয়ন্ত্রন করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ গুলোর একটি।
ফোনটা বেজেই চলেছে। বিনুর চোখ ভিজে উঠল। ০১৯১২……………… ! ট্রেন ছুটছে প্রবল বেগে …কু ঝিক ঝিক…… কু ঝিক ঝিক।