ইন্দ্রনীল ২

ইন্দ্রনীল,

আজ যখন তোমাকে লিখছি, তখন আমি বেদনার নীলে বিষাক্ত নদে স্নান সেরে কেবল গা এলিয়ে দিয়েছি অদৃষ্টের কোলে। অদৃষ্ট শোধালো “ওহে, তোর শেষ ইচ্ছে বল!” মনে পরলো বহুদিন তোমাকে লেখা হয়নি।

ইন্দ্রনীল, চিনতে পেরেছো ? আমি বিনু বালা। সেই যে দু’বেনী করা ছোট দুরন্তপনা মেয়েটি,পড়ার ফাঁকে জেদ ধরে তোমার আঙ্গুল নিয়ে খেলা করতো, আমি সেই বিনু। চিনতে পেরেছো? নাকি তোমার স্মৃতিতে এখন আমি কেবল ধূসর কালো বর্ণে ঝাপসা হয়ে যাওয়া এক প্রতিবিম্ব?

ইন্দ্রনীল, জীবনের শেষ রাতের ট্রেইনটা তীব্র বেগে আমার দিকে ছুটে আসছে। মরণব্যাধী আমায় টেনে হিঁচড়ে ওই ট্রেইনটায় তুলে দিতে চায়।যেতে যেতে থমকে দাঁড়াই, পিছু ফিরি। যদি কোন এক অজানা কারণে হঠাৎ তোমার দেখা পাই! তোমায় না দেখে কি করে যাই বল?

ইন্দ্রনীল, সেই ৩৩ বছর আগে তোমাকে শেষ দেখা। যেদিন অন্যের হয়ে তোমায় ছেড়ে যাচ্ছিলাম, কি অসহায় দৃষ্টিতেই না তুমি আমায় দেখছিলে! তোমার নির্লিপ্ততায় এক অবাক বিস্ময় নিয়ে সেদিন অন্যের হয়ে গিয়েছিলাম। ১৭ বছরের কিশোরীর মন সেদিন এতটা দাহ উত্তাপে পুড়েনি যতটা আজ পুড়ে!

অদৃষ্টের লিখন নাকি কেউ বদলাতে পারেনা। আমিও পারিনি ইন্দ্রনীল। সবুজ কঁচি ঘাসের মত কতবার যে নেতিয়ে পড়েছি ভাগ্য বিধাতার পা’য়ে। তবু রক্ষা হয়নি। দেড় যুগ… দেড় যুগ ইন্দ্রনীল কত হাজার বার যে ধ্বসে পরেছি মেরুদন্ড ভেঙ্গে, কতবার যে সোজা হয়ে দাঁড়াতে গিয়েও নুইয়ে পরেছি পুঁই ডগার মত, কত সহস্রবার যে শরৎতের নীলাকাশে আমার চাপা কান্না মিশে গিয়ে জমাট করেছে কালো কালো বিষণ্ন মেঘেদের, তা কেবল আমার স্রষ্টাই জানেন।

প্রতিরাতে আমি ক্ষতবিক্ষত হয়েছি, বিধ্বস্ত হয়েছি আর অন্ধকার হাতড়িয়ে তোমায় খুঁজেছি। টুঁটি চেপে ধরে কষ্টের দানব যখন আমার শরীরের অস্থি-মজ্জা পিষে দিতে চাইতো, অসহনীয় এক বোবা আর্তনাদে ধরনী কেঁপে কেঁপে উঠতো।

আহ! কি নিষ্ঠুর!

অতঃপর, আহত আমি একদিন ভাঙ্গা ডানায় ভর করে উড়ে গেলাম শুন্যে। একাকীত্বকে সঙ্গী করে তোমার খুঁজে পেড়িয়ে গেলাম শুন্য হতে মহাশুন্যে, মহাশুন্য হতে কৃষ্ণগহব্বর। অসীমের মাঝে ছুটে ছুটে দেখলাম আকাশ তার নীল রং হারিয়ে ধূসর বর্ণে পরিনত হচ্ছে! দেখলাম, সময় থেমে নেই, পৃথিবীর গতি থেমে নেই। কি নিষ্ঠুর! কি নিষ্ঠুর! ইন্দ্রনীল, অনেকটা দুর্গম পথ পেড়িয়ে আজ জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে কেবলই মনে হয়, যদি একটা দিন তোমার হয়ে থেকে যেতে পারতাম! যদি একটা দিন ভালবাসার সাতকাহনে পুর্ণ হয়ে তোমার হাত ধরে ঝিলের দ্বারে হেঁটে যেতাম!

এক যুগের ও বেশী সময় তোমায় খুঁজেছি ইন্দ্রনীল। কেবল নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গী করে পথ, ঘাট, মাঠ, ঝিল সব তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি।

আজ আমার যাবার পালা। তবু যেতে যেতে মন কাঁদে। ভীষণ কাঁদে ইন্দ্রনীল। কোন অজানা ব্যথায় যে মন কাঁদে, কিসের বিরহে যে মন কাঁদে, তা আর কেউ না জানুক, আমি জানি। একটা জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আজ কেবলই মনে হয়, এই এক জীবনের একটা দিন ও আমার বাঁচা হয়নি। ভালোবাসায়, আদরে, মমতায় সোহাগিনীর মত কারো বুকে জড়িয়ে থাকা হয়নি! এ কেমন অদৃষ্টের লিখন আমার!

ইন্দ্রনীল, কোন এক সময় মনে হতো, একদিন তোমার দেখা পাবো। বৃদ্ধা বয়সে হলেও একটা দিন তোমার কাঁধে মাথা রেখে রাতভর জ্যোৎস্না বিলাসী হবো।তাই ভেবে একাই রয়ে গেলাম। আজ বিদায় কালে বুকের ভিতর আবারো ভাঙ্গার শব্দ পাই। হৃদয়ের কোন এক ফুঁটো দিয়ে হু হু করে বিষাক্ত বাতাস ঢুকে পড়ে গভীর থেকে গভীরে। আজ কেবলই মনে হয়, তোমায় দেখা হলোনা।

আজ কেবলই মনে হয়, বুকের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা আমার যাতনা পদ্মপাতার জল হয়েই না হয় গড়িয়ে পড়ুক ধরনীর বুকে। ইন্দ্রনীল, অবশেষে আমি যাচ্ছি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে।যাচ্ছি তোমার মায়া ছেড়ে।

 

ইতি

বিনু