বিদায়!

মিশা আমার শার্ট এর কোনাটা মুঠো করে ধরে আছে।

আমার ভাল লাগছেনা । দুচোখের জল কিছুতেই আটকাতে পারছিনা। ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটের সাদা বিছানার চাঁদর টা চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে। মুখটি ফিরিয়ে নিলাম। বললাম ,

_একটু আসছি ।

_ তুমি যেওনা। আরেকটু থাক ।
বলেই এবার শক্ত করে আমার হাতটি চেপে ধরল মিশা।

_ খারাপ লাগছে মিশু ? মাথায় হাত বুলিয়ে দেব ?

_ নাহ ! শুধু আমার হাতটি ধরে থাক আরও কিছুক্ষন।

গলা ধরে আসে মিশার ।

খুব ইচ্ছে করছে আজ কাদি। পথে পথে ঘুরে কাঁদি। চিৎকার করে আকাশ বাতাস একাকার করে দেই । কেঁদে কেঁদে আজ আকাস ভেঙে বৃষ্টি নামাই। পারছিনা । পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই। পুরুষ হবে লৌহমানব । পুরুষ এর আবেগ অনুভতি ভিতরে পুষে পুষে আগ্নেয়গিরির লাভার মত পুরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তবু পুরুষ কাদবেনা ।
চোখের কোনে কান্না গুলো এসে কুন্ডলী পাকিয়ে জ্বলজ্বল করছে। কাঁদতে পারছিনা।

_ তুমি এমন ভেঙে পরলে গুনগুণ কে দেখবে কে বল ?
নিস্তেজ হয়ে আসে মিশার গলা।

এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। দুহাত পিঠের নিচে দিয়ে, এক ঝাটকায় মিশা কে বুকে জরিয়ে নিলাম। মাথাটা বুকে চেপে নিলাম। জরিয়ে থাকব আজ।
প্রতি মুহূর্তে ও একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে আমার মিশা। অনেক চেষ্টা করেও ডক্টররা হাল ছেড়ে দিয়েছেন । বলেছেন আর কিছুদিন । বোন মেরো ক্যান্সার । কবে, কখন, কিভাবে যে এত বড় ধ্বংস শরীরে বাসা বেঁধেছিল , টের ই পাইনি।

গুনগুন আমাদের মেয়ে। একমাত্র মেয়ে। ২ এ পা দিয়েছে। টুকটুক করে সারা বাড়ি হেটে বেড়ায় ।
দেখতে ঠিক মিশার মত হয়েছে। কতদিন যে আমি মিশার সাথে ঝগড়া করেছি গুনগুন কে নিয়ে !আমি বলতাম গুনগুন দেখতে ঠিক আমার মত। মিশা কোমর কেঁচে ঝগড়া লেগে যেত । বলতো ,
_ নাহ। গুনগুণ আমার মত হয়েছে।

আমি বলতাম,
_ আমার মত। দেখ দেখ নাক টা কি ধারালো।

_ইশ !!! আমার নাক বুঝি বোঁচা !
বলেই মিশা আমার নাকটা চেপে টেনে দিত ।
_আহ ! লাগেতো । ছাড়ো ।
_ ছাড়বনা ।

বলেই মিশা আমাকে বিছানায় ফেলে , দুই হাত চেপে ধরে মুখের কাছটায় ঝুকে বলতো ,
_ গুনগুন আমার মত দেখতে ,ওকে ? গুনগুন আমার ডুপ্লিকেট । যখন আমি থাকবনা, গুনগুন এর মাঝে আমাকে খুজে নিও।

এই বলেই লাফ মেরে বিছানা থেকে উঠে যেত মিশা। ব্যাস্ত হয়ে পরত ঘরের কাজ নিয়ে ।
আমি ভাবতাম , মেয়েটা ত অলুক্ষনে কথা বলে কেন !!!

কি যানি । হয়ত মিশা জানতো একদিন সত্যি গুনগুন এর মাঝে অকে খুজে নিতে হবে !

৭ বছরের ভালবাসার ইতি টেনেছিলাম সেদিন মিশা কে বউ করে। পরিবারের শত বাধা নিষেধ উপেক্ষা করে মিশা কে ঘরে তুলেছিলাম। সেই ছোট্ট টি ছিল। ছোট ছোট বায়না । অল্পতেই গাল ফুলানো । রাগলে যে কি ভয় পেতাম !! আজো ভয় পাচ্ছি। মিশার রাগ কে নয়, মিশা কে ছাড়া বেছে থাকার ভয় !

আজ কত স্রিতি মনের ক্যানভাসে ভাসছে । আমার মিশু। ধীরে ধীরে আমার থেকে সরে যাচ্ছে। কোণো মতেই মিশু কে ধরে রাখতে পারছিনা। প্রার্থনা ছাড়া আর কিছুই করবার নেই এখন। আমার সোণাবৌ, হারিয়ে যাচ্ছে ।

মিশা সেই কখন থেকে আমার বুকে জরিয়ে আছে। অনড় মিশা, আমার বুকে । চারিদিকে কেমন সুনসান নীরবতা ।
এখন আর মিশুর নিঃশ্বাস এর শব্দ সুন্তে পাচ্ছিনা। কান পেতে শুনার চেষ্টা করছি। চারিদিক কেমন শূন্য লাগছে আমার …

আমার মিশা। আমায় একলা ফেলে চলে গেলনা তো !!!! গুনগুন কে একলা ফেলে জেতে পারবে তো !!!
সারারাত মিশার নিথর দেহটি বুকে জড়িয়ে রইলাম।