শুভদা ৪

বুক ফাটটা ক্ষরা রোদে জানালায় মুষ্ঠিবদ্ধ আঙ্গুলের চাপ, অতঃপর অদৃশ্য দহনে বুকের পোড়া দাগ নিয়ে ছুটে চলি আঁধারের বনে। অস্থির মন ছুটে চলে ব্যথার রাজ্যে! পিছনে পড়ে রয় কিছু সোনালী প্রহর; নৈঃশব্দ্যে তিরতির করে বেড়ে উঠা অভিলাষ।
ইদানীং রোজ ভাবি। ভেবে ভেবে চোখের পাতায় ক্লান্তি নামে। তবু মনে হয়, বেঁচে আছি এই তো বেশী। একদিন শুভদা বলেছিল, শোন রানু, তোর সুঢৌল কলমিলতা পায়ে এক জোড়া মল গড়িয়ে দেব!
মনে পরে সেদিন ছিল আমার অবুঝ মনে স্বপ্নের বীজ বপন। অজানা এক ভাল লাগায় প্রতিদিন পুকুর ঘাটে গিয়ে বসতাম। পুকুর জলে পা ভিজিয়ে জল তরঙ্গের খেলায় হারিয়ে যেতাম।
আজ কেবল জলজ সংসারে কাঙ্গালের মত বুকের ভেতর টের পাই রূঢ় বাস্তবতার চাষাবাদ। স্মৃতির বালুচরে আছড়ে পড়া ঢেউ। টের পাই শূন্যতার উঠোনে সুতীব্র ক্রন্দণের অভিবাদন। শুভদা কথা রাখেনি।
কেউ কথা রাখেনি। এ শরীর, এ মন, মনের দোসর….. কেউ কথা রাখেনি।
আজ শুভদার ধার করে রাখা পায়ে মল বাজে না। আজ এ পায়ে পৃথিবীর নির্মম পরিহাস জড়িয়ে থাকে শিকলের গিঁটে গিঁটে। বন্ধ চার দেয়ালে সফেদ আবেশে কেমন মৃত গন্ধ পাই। ওরা আমায় বেঁধে রাখে। এত বলি, ও পায়ে শিকল নয়, ও পায়ে মল দেবো। শুভদা বলেছিল। ওখানে ছোঁয়োনা! কেউ শুনেনা। কেউ কথা রাখেনা।
শেষের দিকে কি যেন হলো আমার। কেমন চুপটি মেরে গেলাম। মানুষের গন্ধে গা গুলিয়ে উঠতে লাগলো। চতুষ্পদ প্রাণিগুলোকে অসহ্য লাগছিল। কারো শব্দ পেলেই দৌড়ে পালাতাম। কখনো উঠোন ছেড়ে ঘরে, কখনো ঘর ছেড়ে তেপান্তরে। প্রিয় মুখগুলো কেমন গায়ে জ্বালা ধরাতে লাগলো।
সব কিছু ভুলে যেতে লাগলাম। মাথার ভেতর কেবল স্বশব্দে হাতুরীর ধমধম শব্দ পেতাম। মনে হতো ভূমন্ডল বুঝি এখনই উলট-পালট হয়ে যাবে।
একদিন বাবার শেভ করার ব্লেড নিয়ে দিলাম ডান কান কেটে। টপটপ করে রক্ত ঝরে পড়তে লাগলো। আমি টেরই পেলাম না। মনে হলো, টুকটুকা রঙে হাতে মেহেদী পরেছি। ইশ! শুভদা যদি দেখতো! তারপর কি হলো জানিনা। শুধু নিজেকে আবিষ্কার করলাম এ বন্ধ কামরায়। বিনু দি এসেছিল কাল দেখতে। ফিসফিস করে মা’কে বলছিল,আমি নাকি আর ফিরে যাবো না।
শুভদা, কোলাহল থেকে দূরে, তোমার থেকে আড়ালে আজ কতদিন এ বন্ধ কামরায় পড়ে আছি। মন্দ লাগেনা। যন্ত্রণার গাড় নীলে শোকাহত হইনা আর। বিনি সুতোয় এ শুভ্রকোণ বাঁধা হয়ে গেছে আমার অদৃষ্টের সাথে। শুধু একটা আকুতি শুভদা! তুমি এসো।ভুল করে হলেও এসো।চলে এসো বৃষ্টির কোন এক সন্ধ্যায়, ভেঁজা মৃত্তিকার স্যাঁতসেঁতে গন্ধ হয়ে উড়িয়ে যেও আমার দীঘল কালো চুল। আমার বুকে লেপ্টে থাকা নোনা কান্না হয়ে এসো। জ্যোৎস্নার এক ফালি আলো হয়ে এসো, নয় বিষাদে জড়ানো ক্লান্ত রাতের পর এক টুকরো আঁধার হয়ে এসো। আমার বুকের পাঁজরের কষ্ট হয়ে এসো। পায়ের শিকল খুলে মল গড়িয়ে দিয়ে যাও। কত বছর ও পা কাউকে ছুঁতে দেইনি মল পড়বো বলে।
তুমি এসো শুভদা! কোন এক বিরহের মধ্যরাতে হৃদয়ের আর্তনাদ হয়ে এসো। ভুল করে এসো। তবুও এসো। কথা দিয়েছিলে। ও পায়ে মল দেবে।তুমি এসো। বিনুদি’কে বকে দিয়ে যেও।