লিউকোমিয়া

উঠতে গিয়ে আবারো চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে এলো। মাথাটা ব্যাথায় ফেঁটে পড়ছে। শরীর নাড়িয়ে খাটের পাশ থেকে পানীর গ্লাসটা নিতেও কষ্ট হয় আজকাল। শুনেছি লিওকেমিয়া নামক এক অদৃশ্য যমদুত ঘুরে বেরাচ্ছে আমার দেহের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে! ঘুরে ঘুরে কুঁড়ে খাচ্ছে আমার বেঁচে থাকার সব উপকরণ। কিমোথেরাপিও কাজ করছে না।

একলা শুয়ে আছি। চোখ বন্ধ। অসাড় মস্তিষ্কে কোন কল্পচিত্রই ভাসে না এখন। এখন শুধু অপেক্ষা; একটা পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষা। কিছু মুখ, কিছু সুখ, কিছু গোপন কষ্ট ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষা। শরীরের কোষে কোষে বিষ ছড়িয়ে পরছে দিন দিন। চোখের কোনে অশ্রু নয়, রক্তবিন্দু ঝড়ে আজকাল। মনে হচ্ছে তলিয়ে যাচ্ছি….রক্তক্ষরণে যেন শরীরের সব শক্তিকে নির্গত করে দিচ্ছে প্রতিটা দিন।আমি অসাড় হয়ে পরছি। আমি এগিয়ে যচ্ছি এক পা, দু’পা করে আমার শেষের অধ্যায়ে। আমার কোন ইচ্ছেও ছিলনা পৃথিবীর মাটি চিরকাল আঁকড়ে থাকার। তবে এত তাড়াহুড়োও তো ছিলনা। শুধু মনে হয়, আর কিছুদিন যদি পেতাম!

কারো অশ্রুসজল চোখ দেখার ক্ষমতা বোধহয় বিধাতা আমায় দেননি।মাকে যতবার দেখি, বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠে। মা আমায় ছেড়ে থাকতে পারবে তো! মা কখনো আমার কাছে কিছু লুকোয়নি। আজকাল অনেক কিছুই লুকায়। আমি টের পাই, মা এর দীর্ঘশ্বাস। আমি দেখি মা এর আড়াল করা চোখের কোণে চিকচিকে হীরকখন্ড! আমার সহ্য হয়না। মা কে বলতে ইচ্ছে হয়, “আম্মুনি, আমায় লুকিয়ে রাখো আর কিছুদিন। শুনেছি যমদুত নাকি মা এর কোল থেকে তার সন্তানকে কেড়ে নেয়ার সাহস করেন না।” বলা হয় না… মা এর যদি কষ্ট বেড়ে যায়!

আচ্ছা, আমি তো চলেই যাবো। মৃন্ময়কে, কে ঘুম পারাবে! আমার নিঃশ্বাসে ওর ছুঁতে না পারলে যে ও ঘুমোতেই পারেনা! আমার ঘন ভারী নিঃশ্বাসের ছন্দ ছাড়া মৃন্ময়ই যে ঘুমোতে পারবে না! চলে গেলেই আমার মুক্তি! মৃন্ময় যে জীবন্মৃত ভেসে বেড়াবে এঘাট থেকে ওঘাটে!

কাল মৃন্ময় এসেছিলো। কেমন জড়োসড়ো শিশুটির মত হাত চেপে বসে ছিল সারা সন্ধ্যা। চোখ তুলে তাকাচ্ছিল না। যতবার দেখেছি মৃন্ময় এর চোখ, বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা কেবল প্রবল হচ্ছিলো। শান্ত শীতল মাছের মত মৃত চক্ষু জোড়া আমায় ধরনীর বুকে আরো কিছু দিন টিকে থাকার লোভটা কে বাড়িয়ে দিচ্ছিলো। পৃথিবী কখনোই আমায় সন্মহিত করতে পারেনি। এত জলদিও তো ছিলনা যাওয়ার!

আজকাল ভাবনা গুলোও খুব এলো মেলো হয়ে আসছে। যে জিনিসের দিকে এক সময় ভ্রুক্ষেপও ছিলনা, আজ তাই পিছু টানে। তলিয়ে যাচ্ছি ধীরে ধীরে! কষ্ট হচ্ছে ভীষণ। একটা রাত মৃন্ময় এর বুকে গুঁটি শুঁটি শুতে না পারার কষ্ট! মায়ের বকুনি খেতে না পারার কষ্ট! একটা আকাশ নিজের করে না পাওয়ার কষ্ট। বৃষ্টি মল পায়ে ভিজতে না পারার কষ্ট!

মৃন্ময়, ক্ষমা করো আমায়! তোমার সাথে আর হবেনা বৃষ্টিস্নান। পায়ের পাতায় পা রেখে কোমর জড়িয়ে হাঁটিহাটি পা পা খেলা! জোছনার এক ফাঁলি আলোয় ভালবেসে সিক্ত হয়ে যাওয়া। হবেনা সন্ধ্যার মুখে ঠান্ডা কাপ হাতে মুখোমুখো বসে অজানায় হাড়িয়ে যাওয়া! ক্ষমা করো মৃন্ময়! তোমায় ছেড়ে যেতে চাইনি। যেতে হচ্ছে! আমি আসবো আবার। তোমার হয়ে, নয়তো পিপিলীকা হয়ে কোন এক দুষিত মৃত্তিকায়। এ ঢাল থেকে ও ঢালে, জমিন হতে জমিনে, নগরে-বন্দরে এক পৃথিবী তছনছ করে হেঁটে বেড়াবো তোমার খুঁজে!

আমার ভালবাসা….. তুমি অপেক্ষায় থেক! আহ! কি যে যন্ত্রনা সারা গায়ে আজ আমার! চোখ মুখ ফেটে লোহিত রক্তধারা ঝড়ছে! নখের ডগায় ডগায় বিষ ছড়িয়ে পড়ছে! মৃত্যু যন্ত্রনাও এত ভয়াবহ হয়!