রাম হোটেলে একদিন

আমি তখন ইংল্যান্ডে। Bureau of Educational and Cultural Affairs (ECA), সেমিনারে অংশ নিতে ২ সপ্তাহের ট্যুর।
সেমিনার শেষে একদিন একাই বেড়িয়ে গেলাম শহর দেখতে।ঘুরে ঘুরে সমস্ত শহর তছনছ করে ফেললাম। সন্ধ্যার মুখে হাঁপিয়ে উঠলাম। টেক্সিতে করে রওনা হলাম ভাল কোন হোটেলের খোঁজে।

অজানা,অচেনা শহরে কিছুই চিনিনা। ট্যাক্সি ড্রাইভারের সহযোগীতায় এক হোটেল পেয়ে গেলাম। রাম হোটেল। নামটার গায়ে বেশ পরিচিত একটা গন্ধ পেলাম। তাছাড়া শহর ছেড়ে খানিকটা দুরে হওয়ায়, হোটেলের আশপাশটা বেশ ভাল লেগে গেল। উঠে পরলাম।

রাতের ডিনার সেরে একটু আগেই সেদিন বিছায়া গা এলিয়ে দিলাম। মাথাটা খুব ঝিমঝিম করছিল।
শোয়ার সাথে সাথেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম, এমন ঘুম যেখানে আমি আর মৃত্যু.. একই সমান।

ঠিক তখনই মনে হলো আমি হঠাৎ ভিন্ন কোন জগতে ঢুকে পরলাম। মৃত্যুর রুপ বা তারও পরের জগৎটা দেখতে কেমন, তা আমার জানা নেই।তবে আমার হঠাৎ ঢুকে পরা জগৎটা কেমন মৃত্যুপুরীর মতই ভয়ংকর মনে হচ্ছিল।
চারদিকে ঘুটঘুটে ভয়ানক অন্ধকার। এ অন্ধকারের সাথে পৃথিবীর অন্ধকারের কোন মিল নেই। চোখ খুলে তাকালেই ভীষন আঁধার।বাহিরে মটমট শব্দে মনে হলো পরিণত কোন ঢাল ভেংগে পরলো।প্রচন্ড শোঁ শোঁ শব্দ শুনতে পেলাম।এমন সময় হঠাৎ বিকট এক শব্দে ঘরের দরজাটা খুলে গেল। খোলা দরজা দিয়ে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর একটা লাল গোলাকার বৃত্ত ঘরে ঢুকে এগুতো লাগলো আমার খাটের দিকে।
বৃত্তটি আমার ঠিক চোখের সামনে এসে এসে মিলিয়ে গেলো। আমার দৃষ্টি স্থির। অনড়। প্রচন্ড শীতের মাঝেও গা বেয়ে ঘাম ঝড়তে লাগলো। মনে হলো আমি বিছানার সাথে লেপ্টে যাচ্ছি!

আচমকা এক তীব্র মিষ্টি গন্ধে ঘর ভরে গেল। গা গুলিয়ে উঠলো। বমি ভাবটা প্রবল হতেই আমি চোখ বন্দ্ব করে ফেললাম। আর তখনই মনে হলো, কিছু একটা ঠিক আমার মাথার পাশ ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে। আমি তার নিঃশ্বাস অনুভব করছি। কি ভয়ংকর। নাইট গাউনটা ততক্ষনে ভিজে চুপচুপা।

ধীরে ধীরে ছায়ামুর্তিটি আমার মুখের কাছটায় ঝুকে পরছে। ঘরের পর্দাটা শব্দ করে দোলছে। দ্রুত নিঃশ্বাসে আমার বুক উঠা নামা করছে।

আচমকা একটা বিকট বিস্ফোরনে ঘর কাঁপিয়ে ছায়ামুর্তিটি বলে উঠে, ” আমি মুক্তি চাই; তুমি আমায় মুক্তি দাও”।
এরপর, ভয়ানক এক অস্থির অনুভুতিতে আচ্ছন্ন হতে হতে আমি তলিয়ে যাই।

যখন ঘুম ভাঙ্গে, তখন চোখ ধাঁধানো তীব্র আলোয় ঘর আলোকিত।
মাথা ঘুরিয়ে পাশ ফিরতেই চমকে উঠলাম। একি ! এ যে আমাকে হোটেলে নামিয়ে দেয়া সেই টেক্সি ড্রাইভার দাঁড়িয়ে!

বিমর্ষ ও বিদ্ধস্ত শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। শীতল দৃষ্টি যেন অনেকটা মৃত মাছের ন্যায়।
টেক্সি ড্রাইভার এবার আমার মুখের কাছটায় ঝুকে এলো। আমি হতবাক কন্ঠে বললাম,
– কি ব্যাপার! আপনি এখানে ? !
– জ্বি ম্যাডাম।
– এখানে কি করছেন?
– আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।

অস্থিরতায় বিহব্ব্বল আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই ভয়ানক শান্ত কন্ঠে টেক্সি
ড্রাইভার বলতে লাগলো,
– ” ৫৬ বছর আগে আমার মৃত্যু হয়েছে। বহুদিন এ ঘরটার নিচে চাপা পরে আছি। আমি মুক্তি চাই। আমায় তুমি মুক্তি দাও”!

অস্থির অনুভুতি নাকি কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয়না। আমার ও হলোনা। এক ঝটকায় সকল আলো ভীষন আঁধারে রুপান্তরিত হতে হতে আমার চেতনা শুন্য হতে লাগলো ।

পরদিন নিজেকে আবিস্কার করি হস্পিটালের বেডে। গলা শুকিয়ে কাঠ, তখনো জিহ্দবা নাড়িয়ে কথা বলতে পারছিনা। পাশে আমার কোচ প্রধান আতংকিত দিশেহারা চোখে দাঁড়িয়ে। অজানা এক ভয়ে আমি আবারো চোখ বন্দ্ব করি………।।!

***** পরবর্ততে জানতে পারি, ইংলান্ডের এই বহুল আলোচিত ” রাম হোটেল” নাকি একটি কবরের উপরে প্রতিষ্ঠিত। এই হোটেলটি ভুতুরে সব কর্মকান্ডের জন্য সমা