বাড়ী নং ১৬৬

বাড়ী নং ১৬৬। দাদার আমলের বাড়ী। এক সময় টিনের চালা। আমার জন্মের ও আগে। তখন আমার আব্বুনী ছিলো জবা টেক্সটাইল মিলস এর ইউনিয়ন লিডার। এর পর ইউপিপির সদস্য। এভাবেই একসময় ধীরে ধীরে রাজনীতির মাঠে তিনি সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধীকারী হন।
প্রায় সময়ই সকালে আমার ঘুম ভাঙতো মুখরোচক নানান প্রগতিশীল রাজনৈতিক আলাপচারিতায়। কখনো বা সালিস-বৈঠকের হট্টগোলে। আব্বুনী বসতেন খালি গায়ে গামছা কাঁধে চেয়ারে পা তুলে। পান চিবুতে চিবুতে কথা বলতেন। তার সামনে গোল হয়ে সবাই বসতো।মাঝে মাঝে আব্বুনী সৌদিয়ানদের মত নকশা করা হুক্কায় টান দিতেন।
সেই সময় চলতো আমাদের উঠোন আকৃতির বিশাল রান্নাঘরে টুংটাং চামচের শব্দ। আমাদের বাড়ীতে তৎকালীন রেওয়াজ অনুযায়ী, একাধিক কাজের লোক ছিল বিধায় আম্মুনীকে কখনো নিজে রান্নাঘরে যেতে হয়নি। আমার যতদুর মনে আছে, আমি একটু বড় হওয়ার পর, আমাদের প্রথম বুয়া ছিল পেয়ারা নামে একজন। আমি তাকে কাকী ডাকতাম। তারপর ধীরে ধীরে ওদের সন্তান সন্তুতি ও আরো নতুন অনেকেই আমাদের বাড়ীতে কাজ করে। তাদের ছেলে মেয়ে, নাতী পুতিরা এখনো আমাদের বাড়ীতেই কর্মরত আছেন।
আব্বুনী ছিলেন খুব ভাবুক। তার লিখার হাত ছিল বেশ। সুনীপুন লিখায় কলমের কালীতে তিনি ফুটিয়ে তুলতেন জীবনের প্রেম, অদ্ভুদ রহস্য ও মানুষের মনের গোপন ইচ্ছা আকাং্খা।
মনে পরে, আমি তখন খুব ছোট। একবার আব্বুনীর কেরিয়ারে ধশ নামে। আমরা খুব বিপর্যস্ত হয়ে পরি। বাড়তি বিলাসিতা করে কাজের লোক রাখা, বেতন দেওয়া একটু কষ্টসাধ্য হয়ে পরে। আমাদের বাগান মালী, বাবুর্চি, অন্যন্য কাজের লোকদের আব্বুনী চলে যেতে বলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আব্বুনীর প্রতি ওরা এতই উদার ও নমনীয় ছিলেন যে, কেউ যেতে রাজি হলেন না। বিনা বেতনেই সবাই আমাদের ছত্রছায়ায় থেকে গেলেন।
ওরা এখনো বেঁচে আছেন। কিন্তু বার্ধক্যের কারনে, এখন ওরা আর কাজ করতে পারেন না। তবে ওদের ছেলে-মেয়ে, নাতি-পুতিরা এখনো আমাদের পরিবারেই আছেন।
সব আছে। সবাই আছেন। সেই বহু বছর পুরানো আম গাছ, বাড়ীর পিছনের উঠোন, সেই মানুষজন, আব্বুনীর চশ্মা, জলচৌকি, বেহালা, রাজনৈতিক সুত্রে পাওয়া অসংখ্য প্রাইজ, কবিতা-গানের ডাইরী….!! শুধু নেই আব্বুনী!!!