ইসমাইলকে লিখা সিএনজি চালক রিপনের শেষ চিঠি

প্রিয় বন্ধু,
ভেবেছিলাম না বলেই চলে যাবো। কিন্তু কথা যে শেষ হয়নি; এখনো অনেক কিছুই বাকি!

বন্ধু,আমি হয়তো মারা যাচ্ছি! ডাক্তার বলেছে দুটো পা কেটে বাদ দিলে বেঁচে যাবো। আমার মনে হচ্ছে ওরা আমাকে শেষ রক্ষা করতে পারবেনা। ওরা মিথ্যে বলছে।ক্রমশ আমার শরীর ঝিমিয়ে পরছে,মাথায় এক অদ্ভুত যন্ত্রনা। চোখের সামনে সব কেমন ঘোলাটে! তোর সাথে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল তুই যদি বুঝে ফেলিস আমি মারা যাচ্ছি! যদি তুই দুষ্টুমীতে আমার চেহলাম খেতে না চাস!

মৃত্যু চিরন্তন সত্য। তবে এত চট জলদি মৃত্যু কাম্য ছিলনা।অনেক কিছু করা হয়নি। ভালবেসে কোন সুনয়নার চোখে তাকানো হয়নি,পথে হাটতে হাটতে বাদাম চিবোনি হয়নি, তার পাশে হাত ধরে বসা হয়নি।এখনই চলে যেতে হচ্ছে!

হয়তো কাল সকালে আমি থাকবোনা, তুই কাঁদবি, স্বজনরা কাঁদবে। হয়তো এক সময় মাটি চাপার সাথে আমিও চাপা পরে যাবো তোদের স্মৃতিতে।

প্রিয় বন্ধু, আমি ফিরে আসবো! হ্যা, আমি আসবো!

হয়তো আবার আসবো ফিরে এই পৃথিবীর বুকে, যদি আসি ফিরে পৃথিবীর মানুষ হয়ে,তবে সময় কে পেড়েক ঠুকে দেবো ঘড়ির কাটার গায়ে। হয়তো আসবো ফিরে মাকড়শা নয় বাবুই পাখি হয়ে,গুটি গুটি পায়ে বাসস্থানের খুঁজে এদিক ওদিক ছুটে বেড়াবো। হয়তো পোষা বিড়াল হয়ে গুটিয়ে থাকবো সুনয়নার পায়ের কাছে, গা ঘেশে!
কিংবা, অষ্টাদশী চাঁদ হয়ে মাঝ রাতে চুপিসারে আলো বিলাবো কপোত-কপোতীর ভিরে!

প্রিয় বন্ধু, আজ যেতে কষ্ট হচ্ছে। অঝোর বর্ষনে হৃদয়ে সৃস্টি হচ্ছে বেদনার জলাশয়।সেখানে দেখি ছোট বড় ডিঙি নৌকায় হরেক রকমের কষ্ট ভেঁসে যায় এপার থেকে ওপারে! অতঃপর, অদৃশ্য হয়ে যাওয়া মাঝ দরিয়ার নৌকাটিও ফিরে আসে কিনারায়; কিন্তু আমি ফিরার পথ ভুলে,ভেসে যাচ্ছি অন্য কিণারায়।

আমি চলে গেলে, আমার জন্য দুঃখ করিস না। তুই ছিলি আমার প্রিয় বন্দ্বু, আমার মৃত্যুর আগ মুহুর্তে শান্তনার এতটুকু আশ্রয়। তোকে বলতে পারিনি বন্দ্বু, আমি মারা যাচ্ছি। বলতে পারিনি আমাকে বাঁচিয়ে রাখ! কি লাভ হতো বলে? পা দুটো যে কাটা যাচ্ছে, প্রাণটা যে নিস্তেজ হয়ে আসছে!

বন্ধু আমার,
আমি মরে গেলে, আমার কবরের পাশে অশ্রুসজল নয়নে দাড়িয়ে থাকিস না;আমি তো ওখানে নেই! আমি ঘুমুচ্ছিনা,আমি সর্বত্র।আমি আছি প্রকৃতির সবুজে, হাজার মাইল বেগে তেড়ে আসা বৈশাখী বাতাসে,আছি নিবু নিবু তারা হয়ে রাতের আকাশে।ভোরের প্রথম আলোয় তোর ঘুম ভাঙানো পাখির শব্দে,সোনালী ঝিকিমিকি রোদ্দুরে, আছি বিশুদ্ব বাতাসে। বন্ধু, আমি আছি ছায়ার মত তোর পাশে।

রোজ রাতে,আমাদের পুরনো সেই জায়গাটায় গিয়ে বসিস,যেখানে তুই আর আমি সিএনজি থামিয়ে এক সাথে সিগারেট ফুঁকতাম। গল্প করতাম।
আমায় রেখে সিগারেট খাবিনা বলে দিলাম, খবরদার! তুই আসিস, আমি অদৃশ্য ছায়া,তোর পাশে বসে থাকবো। তোর অনুভবে, হয়তো ছুঁয়ে দিতে পারবোনা, তবু থাকবো।

বন্ধু, যেতে যেতে একটি গোপন ইচ্ছের কথা বলে যাই,অনেকদিন ভেবেছি, আমার সিএনজিতে করে তোকে আর তোর প্রেয়সীকে ঘুরাবো।তোদের গল্পকালে,সামনের আয়নায় আড়চোখে তোদের ভালবাসাময় চোখ দেখবো।

মানুষের সব ইচ্ছা পুরণ হয়না। কিছু ইচ্ছা নাকি পুরণ হতে নেই! কিন্তু, আমার কোন ইচ্ছাই তো পুরণ হয়নি বন্ধু! মেঘের শুভ্রতায় খন্ড মেঘ ছুঁয়ে দেখা হয়নি। সবুজ প্রান্তরে ঘাশফড়িংয়ের পিছু ছুটা হয়নি।সমাধীকালে দু’কলম এফিটাফ লিখা হয়নি। ভ্যাপসা গরমে পথ চলতে চলতে জীবনের হিসেব কষা হয়নি। কিছুই তো করা হয়নি বন্ধু!

প্রিয় বন্ধু, আমি মারা যাচ্ছি! যেতে যেতে তোকে কাঁদিয়ে যাচ্ছি। কি স্বার্থপর আমি, তাই না?

তুই ভাল থাকিস বন্ধু। মনে করে আমার চেহলামে আসতে ভুলিস না।

ইতি,
রিপন।